English Version
আপডেট : ৪ এপ্রিল, ২০১৮ ১৫:১৪

নিজের দীনতার ক্ষমা চাওয়াই একালের বড় দায়

অনলাইন ডেস্ক
নিজের দীনতার ক্ষমা চাওয়াই একালের বড় দায়

মানবেতিহাসের যেটুকু পথ মানুষ পাড়ি দিয়ে এসেছে তার সঙ্গে বদলেছে দাসবৃত্তির ধরণ। এটা এমন এক বৃত্তি, যেখানে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে খাটিয়ে বিকৃত ‘তৃপ্তি’পায়। এ তৃপ্তি আনন্দের নয়, বরং পাশবিক। কেননা মানুষ অপর কোনো মানুষের দাস— এটা একর্থে মনুষ্যত্বেরই অবমাননা। অন্যদিকে যারা খেটে মরে, তারা নানা ‘মন্তব্য’ করেই মজা পায়। আভির্ভূত মহাপুরুষদের জীবনে দেখা যায়— দাসবৃত্তির বিরুদ্ধেই ছিল তাদের পরিচালিত জীবনের সিংহভাগ কর্মকাণ্ড। তবুও মানুষের আচারিক জীবন থেকে বিলুপ্ত হয়নি এ ঘৃণিত বৃত্তি। যদিও এখন আর সে যুগ নেই। আধুনিককালে এসে পাল্টেছে দাসের ধরণ। এখন মানুষ বেঁচে আছে ততোধিক ভয়ানক এক দাসবাজারে। স্বতন্ত্র-স্বক্ষমভাবে মুক্তচিত্ততায় মানুষের বেঁচে থাকা প্রায়ই যেন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। গোটা একটা সমাজব্যবস্থায় কিংবা রাষ্ট্রে প্রতিটা মানুষই এখন কোনো না কোনোভাবে ‘দাস’।

দাসবৃত্তি নিয়ে এতো কথা বলার পেছনে রয়েছে ‘চাকর’ শ্রেণি নিয়ে সমাজের ধ্যান-ধারণার গল্প। কে কোন অফিসে কী ধরনের এবং কোন পদে চাকরি করেন সেটা এখন আরসব কিছু ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে। এর ওপর নির্ভর করে জোটে সামাজিক সম্মান-অসম্মান ও অবস্থান। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার চাকরের পাশাপাশি সমাজের আরেকটা বৃহৎ গোষ্ঠী থাকে। যারা এই ‘চাকুরে’দের নিয়ে ইতিবাচক ও নেতিবাচক নানা ধারণা পোষণ করেন। এর মধ্যে মনগড়া ধারণা যেমন রয়েছে, তেমনি আছে কিছু বাস্তবতাও। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের প্রত্যাশাও থাকে কার কাছ থেকে কী ধরনের আচরণ পাবে। এর ব্যত্যয় হলে যে কোনো ‘ব্যক্তিমানুষ’ গোটা সমাজের কাছে অপাঙক্তেয় হয়ে ওঠে। এমনকি যথার্থ কোনো যুক্তিবুদ্ধি ছাড়াই সে মানুষটা নিয়ে যাচ্ছে তাও বলতে থাকে। এসবের পেছনে থাকে একটা সামগ্রিক হতাশা। আর মূলে থাকে নানাভাবে বঞ্চনার ক্ষোভ। যদিও সেসবের জন্য একা ‘ব্যক্তিমানুষ’টা কোনও অর্থেই দায় নিতে পারে না।

চাকরির বাজারে এখন ‘সরকারি’শব্দটা অত্যন্ত অর্থবহ। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকোনোর আগেই এখন যেকোনো শিক্ষার্থীর ‘টার্গেট’ থাকে সরকারি চাকরি পাওয়ার। তার জন্য কারোর থাকে পড়াশোনার প্রস্তুতি। আবার কেউ কেউ নির্ভার থাকে। এই নির্ভার থাকারা ‘আত্মীয়-সমাজব্যবস্থার’অন্তর্গত। কিংবা এদের পরিবারের থাকে অঢেল অর্থকড়ি। চাকরি প্রত্যাশীদের অধিকাংশই দেশের কোনো না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের পড়তে হয় নানা চাকরির পড়া। এরমধ্যে প্রধান এবং আরাধ্য হলো— ‘বিসিএস’। এই শব্দটা উচ্চারণে যতোটা সহজ, তা আত্মস্থ করা কোটিগুণ কঠিন। এর মাহাত্ম একমাত্র তাদের পক্ষেই ধারণা করা সম্ভব— যাদের জীবনের অন্তত তিন-চার বছর ধ্যানের মতো করে ‘বিসিএস’-এর পেছনে ব্যয় করতে হয়েছে। এটা এমন এক শারীরিক-মানসিক ত্যাগ-তিতিক্ষার ব্যাপার, যে কারোর পক্ষে তা বুঝে ওঠা দুঃসাধ্য।

সম্প্রতি একটা ভুয়া খবর সচেতন পাঠকের গোচরে এসেছে। যার শিরোনাম ‘রেল স্টেশনে বৃদ্ধা মাকে ফেলে গেলেন বিসিএস ক্যাডার ছেলে’। হাতে লেখা একটা চিরকুটও ঘুরেছে সে খবরের সঙ্গে। কোনো এক অখ্যাত নিউজ পোর্টাল প্রথমে এ সংবাদটি প্রচার করে। তারপর মূলধারার কয়েকটি সংবাদপত্র প্রকাশ করে তাদের অনলাইন ভার্সনে। সত্য-মিথ্যার হেরফের পৃথক করতে প্রায় ভোঁতা হয়ে আসা বিপুল জনগণ সেটা গিলে নিল মুহূর্তে। নিজেদের সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে দিলো হুড়হুড় করে। আর তাতে মন্তব্য আসতে লাগলো নানা ধরনের। তাতে সমূহ ক্ষোভ প্রকাশিত হলো মানুষের। সে ক্ষোভ যতটা না সে ‘মায়ের প্রতি অবহেলার জন্য’, তার অধিক ক্ষোভ লোকটা বিসিএস (ক্যাডার) কর্মকর্তা বলে! ততধিক ক্ষোভ তার ‘ম্যাজিস্ট্রেট’বউয়ের প্রতি, যার কারণে মাকে ফেলে আসতে হলো রেলস্টেশনে!

বরাবরের মতো এ সংবাদেও একশ্রেণির মধ্যমেধার মানুষ সে বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তার স্ত্রীর দোষ খুঁজে পেল। আরেক শ্রেণির কথিত নারীবাদীরা তার প্রতিবাদে আগাগোড়া বাস্তবতাবর্জিত কথাবার্তা বলা শুরু করলো। সবমিলিয়ে বেশ কদিন সরগরম রইলো অনলাইন মিডিয়া। আবার নতুন খোরাক পেয়ে সে ভুয়া খবর থেকে মুখও ফিরিয়েছে। এরই মধ্যে এ মতামত লেখক উদঘাটন করতে সমর্থ হলো ওই হাতে লেখা চিরকুট পশ্চিমবঙ্গের কোনো এক জায়গা থেকে ছড়ানো হয়েছে। আর এ চিরকুটটিই মূলত সে ভুয়া খবরের উৎস। বাংলাদেশে সেটি ফেসবুকে প্রচার করেন জনৈক ব্যারিস্টার! তার ফেসবুকের পাতা থেকে সেটি নিয়ে একটি নিম্নমানের অনলাইন পোর্টাল খবর হিসেবে প্রকাশ করে। আর সেটা লুফে নেয় প্রথমসারির একটি পত্রিকা। তারপর ছড়িয়ে পড়ে আরো দু’টি পত্রিকার অনলাইন ভার্সনে। যদিও পরে একটি পত্রিকা তাৎক্ষণিকভাবে খবরটি সরিয়ে নেয়।

আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলোর সুস্থতা আছে কি না কেউ যদি সে প্রশ্ন তোলে অমূলক হবে না। এদের অধিকাংশই এমন সব খবর প্রকাশ করে যার কোনোটা সর্বাংশে মিথ্যা। আবার কোনোটার ছোটোখাটো ভিত্তি থাকলেও ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে এমন করা হয় যে সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্য-মিথ্যাই যাছাই করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ব্যাঙাচির মতো গজিয়ে ওঠা সহস্র নিউজ পোর্টাল, তাদের নিয়ে বলার কিছু নেই। এগুলোর জন্মের মতো ঝরে যাওয়াও শুধু সময়ের ব্যাপার। এ ক্ষেত্রে হাতে গোনা অন্তত সাত কি আটটা নিউজ পোর্টাল বাদ দিলে বাকিগুলোর এ পরিণতি হবেই। তাই সে নিয়ে কথা বলাও অনর্থক বলে মনে করছি।

তাহলে দেখা যাচ্ছে শোর পড়লো একটি আগাগোড়া মিথ্যা সংবাদ নিয়ে। সংবাদটি যদি সত্যও হয়ে থাকে, তাহলে সমাজের কিছু বা কিছু অতিরিক্ত মানুষ বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের ওপর নাখোশ কেন, কেন সাধারণ মানুষ সুযোগ পেলেই তাদের ধুয়ে দিতে উঠেপড়ে লাগে— বুঝবার অবকাশ রয়েছে। নানা কারণে বহুধাবিভক্ত সমাজব্যবস্থায় এখন ‘ব্যক্তিস্বার্থ’ অন্যতম লক্ষ্যে-মৌক্ষে পরিণত। বলা যায় এর বাইরে বৃহৎ কোনো চিন্তা আজকাল মানুষ করতে পারছে না। যে কারণে সরকারি সুযোগ সুবিধা যারা পান, বিশেষ করে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি মানুষের ক্ষোভ সীমাহীন। এরই প্রতিফলন দেখা গেল ভুয়া সংবাদের নিচে নানাজনের মন্তব্যে। এসব মন্তব্যের পেছনে আত্মগ্লানি যেমন রয়েছে, তেমনই দায় আছে প্রতিষ্ঠিত অজ্ঞতার। এ অজ্ঞতা জনমনে চাউর করতে গণমাধ্যম অন্যতম নিয়ামকের ভূমিকা রেখে চলেছে। গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে আমার মনে হয়— নিজের কাছে নিজের অজ্ঞতা আর দীনতার ক্ষমা চাওয়াই যেন একালের বড় দায়।

লেখক: কবি, সাংবাদিক, গবেষক