বহুমুখী চাপে আক্রান্ত ইউরোপের অর্থনীতি
ইউরোপের অর্থনীতি সবচেয়ে ভালো পারফরম্যান্স দেখায় ২০১৭ সালে। তবে শিগগিরই এর পুনরাবৃত্তি হবে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ বিভিন্ন সংকটে ইউরোপের সার্বিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। নতুন বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা, ব্রেক্সিট নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকটের কারণে ইউরোয় আস্থা কমতে পারে এবং ব্যাংকগুলো চাপে পড়তে পারে। খবর সিএনএন বিজনেস।
ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক (ইসিবি) মনে করছে, চলতি বছরে ইউরোজোনের প্রবৃদ্ধি কমে ২ শতাংশে দাঁড়াবে, যেখানে ২০১৭ সালে তা ছিল ২ দশমিক ৫০ শতাংশ। গত বছরে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ভালো অবস্থানে থাকা ইউরোজোন আবারো বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির চেয়ে পিছিয়ে পড়তে যাচ্ছে।
ব্যবসা ক্ষেত্রে এরই মধ্যে সামগ্রিক অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বুধবার প্রকাশিত পারচেজিং ম্যানেজার্স জরিপে আইএইচএস মার্কিট ইঙ্গিত দিচ্ছে, অক্টোবরে দুই বছরের মধ্যে সবচেয়ে মন্থরগতিতে সম্প্রসারিত হতে যাচ্ছে ইউরো অর্থনীতি। জরিপে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক বাণিজ্য বিরোধের কারণে ইউরোপীয় রফতানি পণ্যের চাহিদা কমে গেছে। আরো আশঙ্কাজনক খবর হলো, ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে দাঁড়িয়েছে।
ইসিবি বৃহস্পতিবার অবশ্য জানিয়েছে, পরিস্থিতি অতটা আশঙ্কাজনক নয় যে, আগামী ডিসেম্বরে সংস্থাটির বৃহৎ প্রণোদনা প্রকল্প স্থগিতের পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হবে। ২০১৫ সাল থেকে সরকারি বন্ড ক্রয় করে ইসিবি ২ দশমিক ৭০ ট্রিলিয়ন ইউরো (৩ দশমিক ১০ ট্রিলিয়ন ডলার) ওই অঞ্চলের অর্থনীতিতে সরবরাহ করেছিল।
ইউরোপের দুর্বল প্রবৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বহুমুখী বাণিজ্যযুদ্ধ। ইইউ থেকে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানিতে উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে চলা বাণিজ্যযুদ্ধেও ক্রসফায়ারে পড়েছে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের এক জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ স্টিফেন ব্রাউন বলেন, ‘অনেক কোম্পানি রয়েছে, যেগুলো বিভিন্ন উৎপাদনমুখী কারখানায় যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে আসছিল বা সাধারণ বিনিয়োগ পণ্য সরবরাহ করছিল। এগুলোর ওপর বাণিজ্যযুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে।’
সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়েছে ইউরোপের রফতানির শক্তিঘর হিসেবে পরিচিত জার্মানি, সাম্প্রতিক মাসগুলোয় যাদের রফতানিতে মারাত্মক পতন দেখা যাচ্ছে। জার্মান চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড কমার্স ২০১৮ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস কমিয়ে ১ দশমিক ৮০ শতাংশ করেছে, যেখানে আগে ২ দশমিক ৭০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস ছিল। আইএইচএস মার্কিটের জরিপে দেখা গেছে, বিদেশ থেকে ক্রয়াদেশ প্রত্যাহার এবং গাড়ি শিল্পে সংকটের কারণে জার্মানির রফতানি লক্ষণীয়ভাবে কমেছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধ এবং ডিজেল কেলেঙ্কারির কারণে জার্মান গাড়ি নির্মাতারা ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। বিএমডব্লিউ ও মার্সিডিজ বেঞ্জের স্বত্বাধিকারী ডেইমলার তৃতীয় প্রান্তিকে তাদের আয়ে পড়তির কথা জানিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকি ইউরোপীয় গাড়ি শিল্পের জন্য আরেকটি বড় ঝুঁকি নিয়ে আসছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা না উঠিয়ে নেয়, তাহলে ইউরোপে সংযোজিত গাড়িতে উচ্চ শুল্কের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প।
ইউরোপের জন্য আরেকটি বড় সংকটের নাম ব্রেক্সিট। ২০১৯ সালের মার্চে ইইউ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য। কিন্তু মূল ভূখণ্ড ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের কোম্পানিগুলো ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না এর ফলে আন্তঃসীমান্তে ব্যবসা করতে তাদের কী কী সমস্যা হতে পারে। জনমনে এ আশঙ্কা রয়েছে, যুক্তরাজ্য এমন একটি অস্পষ্ট চুক্তির মাধ্যমে ইইউ থেকে বেরিয়ে আসছে, যে বিষয়ে কোম্পানিগুলো ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্পষ্টতা নেই। মার্চে কোনো চুক্তি না করে ইইউ থেকে বেরিয়ে এলে কিছু কোম্পানির জন্য তা বেশ অস্বস্তিকর ঠেকবে। ব্রেক্সিট কার্যকরের এক মাসের মধ্যেই নিজেদের মিনি কারখানা বন্ধ করে দেবে বিএমডব্লিউ। কারণ তারা যন্ত্রাংশ কীভাবে পাবে, এ নিয়ে অস্পষ্টতায় রয়েছে। ব্রেক্সিট নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে প্রায় এক হাজার শ্রমিকের সাপ্তাহিক কর্মদিবস ক্রিস্টমাসের পূর্ব পর্যন্ত তিনদিনে নামিয়ে এনেছে জাগুয়ার। উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোর ব্যবসা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ব্রেক্সিট অনিশ্চয়তায় খাবার ও ওষুধ মজুদ করছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা।
ইউরোপীয় রাজনীতিও অঞ্চলটির অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইইউ আইন লঙ্ঘন করে ইতালির বাজেটে ব্যয় বৃদ্ধির ঘোষণা আসায় দেশটির সমালোচনা করেছে ইউরোপীয় কমিশন। এ পদক্ষেপ থেকে ইতালিকে হয় সরে আসতে হবে, নতুবা জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে। বিনিয়োগকারীরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, রোম ও ব্রাসেলসের মধ্যে বিরোধ আরো বাড়তে পারে, যা ইতালির দুর্বল ব্যাংকিং খাতকে আরো চাপে ফেলবে। এর ফলে তা ইতালির নাজুক অর্থনীতির ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে।
ক্যাপিটাল ইনডেক্সের রিসার্চ ডিরেক্টর ক্যাথলিন ব্রুকস বলেন, ‘ইউরোজোনের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হচ্ছে ইতালি। তাই এর আর্থিক পরিস্থিতি পুরো ব্লকটির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।’


