English Version
আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১১:৩৪

আজ সেই ভয়াবহ নাইন-ইলেভেন

অনলাইন ডেস্ক
আজ সেই ভয়াবহ নাইন-ইলেভেন

আজ সেই ভয়াল ১১ সেপ্টেম্বর (নাইন-ইলেভেন)। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হামলার ১৭তম বার্ষিকী। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ একটি দিন। ২০০১ সালের এইদিনে আত্মঘাতী বিমান হামলায় ধ্বংস হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের অহঙ্কার ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার বা বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র। ভবনটি টুইন টাওয়ার নামে অধিক পরিচিত। হামলা চালানো হয়েছিল অন্যতম প্রধান পরাশত্তি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের সদর দফতর পেন্টাগনের পশ্চিম অংশেও। সন্ত্রাসীদের ছিনতাই করা চার বিমান হামলায় ৯০টিরও বেশি দেশের তিন হাজারের বেশি লোক নিহত হয়েছেন। আর আহত হয়েছেন ১০ হাজারের বেশি। নিহতদের মধ্যে চার বিমানের ২৬৫ যাত্রী, বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের ও আশপাশের ২ হাজার ৬শ’ ছয়জন, পেন্টাগনের ১২৫ জন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৭২ সদস্য ও ৫৫ সামরিক কর্মকর্তা। ১৯ জনের একটি সন্ত্রাসী দল চারটি বিমান ছিনতাই করে এ সিরিজ হামলা চালিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের জন্যও ইতিহাসের ভয়াবহতম দিন ছিল এটি। হামলায় ফায়ার সার্ভিসকর্মীদের মধ্যে একদিনেই মারা যান ৩৪৩ জন। আর আহত হন আরো দুই হাজার, যাদের অনেকের অবস্থাই ছিল গুরুতর।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সকাল বেলার ঘটনা। চমৎকার আবহাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে কর্মস্থলের দিকে যাচ্ছিলেন। সকাল ৮টা ৪৫ মিনিট। আমেরিকান এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ১১ লোগান বিমানবন্দর থেকে লসঅ্যাঞ্জেলসের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। বিমানটিতে ১১ জন ক্রুসহ ও ৭৬ জন (সন্ত্রাসী বাদে) যাত্রী ছিলেন। পাঁচ ছিনতাইকারী বিমানটি তাদের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পর বোয়িং ৭৬৭ বিমানটি মূল রাডার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রায় বিশ হাজার গ্যালন জেট ফুয়েল থাকা বিমানটি কিছু সময় পরেই আঘাত হানে নিউইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের নর্থ টাওয়ারে। ১১০ তলা ভবনটির ৮০তম তলায় আঘাত হানে ওই বিমানটি। এতে মুহূর্তের মধ্যেই পুরো ভবনটি ধসে পড়ে।

আকস্মিক ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে পড়েন মার্কিনীরা। তাদের মনে নানা প্রশ্ন কি ঘটছে। অনেকে এটিকে মাতালের কাণ্ড বলেও মনে করেন। তবে তাদের ধারণা পাল্টে যায় ঠিক ১৮ মিনিটের ব্যবধানে। প্রথম বিমান হামলার পর একই বিমানবন্দর থেকে লসঅ্যাঞ্জেলসগামী ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স ১৭৫ ফ্লাইটের আরেকটি বোয়িং ৭৬৭ বিমান সকাল সোয়া ৮টার দিকে যাত্রা শুরু করে। বিমানটিতে ৯ জন ক্রু ৫১ জন (সন্ত্রাসী বাদে) যাত্রী ছিলেন। পাঁচজন ছিনতাইকারী বিমানটি নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে সকাল ৯টা ৩ মিনিটের সময় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সাউথ টাওয়ারের ৬০তম তলায় হামলা চালায়। এ সময় প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হয়, ভবনের বিভিন্ন অংশ খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে আশপাশের ভবনগুলোর ওপর ছড়িয়ে পড়ে। তখনই মার্কিনীরা বুঝতে পারে তাদের দেশের ওপর সন্ত্রাসী হামলা শুরু হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে স্মরণকালের এ হামলা চালানোর জন্য সন্ত্রাসীরা চারটি যাত্রীবাহী বিমান হাইজ্যাক করে। মোট উনিশজন জঙ্গি সরাসরি অংশগ্রহণ করে হামলাতে। সন্ত্রাসীদের ছিনতাই করা বিমান চারটির মধ্যে দুটির লক্ষ্য ছিল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর ও দক্ষিণ টাওয়ারে আঘাত করা। সন্ত্রাসীরা এ লক্ষ্য পূরণ করতে পেরেছিলেন। তাদের তৃতীয় বিমানটি আঘাত করে অন্যতম পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের হেড কোয়ার্টার পেন্টাগনে। আমেরিকান এয়ারলাইন্স ৭৭ ফ্লাইটের বিমানটি ওয়াশিংটন ডুলেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সকাল ৮টা ২০ মিনিটে লসঅ্যাঞ্জেলসের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। বোয়িং ৭৫৭ বিমানটিতে ৬জন ক্রুসহ মোট ৫৩ জন (সন্ত্রাসী বাদে) যাত্রী ছিলেন। পাঁচজন সন্ত্রাসী বিমানটি ছিনতাই করে সকাল ৯টা ৪৩ মিনিটের সময় ভার্জিনিয়ায় অবস্থিত প্রতিরক্ষা বিভাগের সদর দফতর পেন্টাগনে হামলা চালায়।

নিউজার্সির ন্যুয়ার্ক লিবার্টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ৯৩ নামে চতুর্থ বিমানটি ৭ ক্রু ও ৩৩জন যাত্রী (সন্ত্রাসী বাদে) নিয়ে উড়েছিল সানফ্রান্সিসকোর উদ্দেশ্যে। সকাল ৮টা ৪২ মিনিটে য়াত্রা করার ৪০ মিনিটের মধ্যেই বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় চার ছিনতাইকারী। বিমানটি দেরিতে যাত্রা করায় যাত্রীরা আগেই জেনে গিয়েছিলেন টুইন টাওয়ারে হামলার বিষয়টি। ছিনতাইকারীরা বিমানটি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পর তারা বুঝতে পারেন আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটতে চলেছে। কয়েক যাত্রী অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র নিয়ে ককপিটে হামলা করেন, বাধা দেন ছিনতাইকারীদের। নিউইয়র্ক টাইমসের ভাষ্য, ছিনতাইকারীদের সঙ্গে রীতিমতো ধস্তাধস্তি চলে। সকাল ১০টা ৩ মিনিটের সময় পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে আছড়ে পড়ে বিমানটি।

হামলাকারীরা বিমানটিকে কোথায় নিতে চেয়েছিল তা পরিষ্কার না হলেও বিশ্লেষকরা মনে করেন, হোয়াইট হাউজ, মেরিল্যান্ডে প্রেসিডেন্সের অবকাশ যাপন কেন্দ্র ‘ক্যাম্প ডেভিড’ অথবা পশ্চিম উপকূলে থাকা কয়েকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কোনো একটিতে হামলা চালানো ছিল তাদের লক্ষ্য।

তৎকালীন জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিমান হামলাকারীদের সবাই ছিলেন সৌদি আরব ও অন্য কয়েকটি আরব দেশের নাগরিক। বুশ প্রশাসন ওই সময় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আল কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেনকে অভিযুক্ত করে বলে, হামলার জন্য সন্ত্রাসীদের অর্থায়ন করেছিলেন লাদেন। হোয়াইট হাউস থেকে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন, পারস্য উপসাগরে ওয়াশিংটনের ভূমিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে সন্ত্রাসীরা এ জঘন্য হামলা চালিয়েছে।

বুশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, হামলাকারীদের বেশ কয়েকজন যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন এবং তারা বাণিজ্যিক ফ্লাইং একাডেমি থেকে বিমান চালনার প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। হোয়াইট হাউস থেকে ওই সময় বলা হয়, হামলাকারীরা সহজেই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে বক্স কাটার এবং ছুরি নিয়ে বিমানে উঠতে সক্ষম হন। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলীয় তিনটি বিমানবন্দর থেকে ক্যালিফোর্নিয়াগামী চারটি বিমানে চেপে বসেন তারা। কারণ হিসেবে বুশ প্রশাসন জানায়, দীর্ঘ যাত্রার জন্য জ্বালানিপূর্ণ থাকে এসব বিমান।

নাইন ইলেভেন সন্ত্রাসী হামলায় প্রবল পরাক্রমশালী যুক্তরাষ্ট্রে প্রচণ্ড উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনা করে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে সারাদিনই সরিয়ে নেয়া হয় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। পরে সন্ধ্যা সাতটায় হোয়াইট হাউজে ফেরেন তিনি। রাত ৯টায় দেশবাসীর উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে তিনি বলেন, সন্ত্রাসীরা আমাদের সর্বোচ্চ ভবনগুলোর ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে, কিন্তু তারা যুক্তরাষ্ট্রের ভিত কাঁপাতে পারেনি। সামরিক পদক্ষেপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যারা সন্ত্রাসী কাজে লিপ্ত তারা এবং সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয় দেয় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

তবে নাইন ইলেভেন সন্ত্রাসী হামলার পেছনে অনেক প্রশ্ন রয়েছে যার উত্তর আজো জানতে পারা যায়নি। ৯/১১ এর ঘটনা সম্পর্কে যে প্রশ্নটি আসে তা হলো প্রকৃতপক্ষে হামলা কারা ঘটিয়েছিল? একই দিনে খুব কম সময়ের ব্যবধানে চারটি বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা মার্কিন প্রশাসন জানতে পারলো না। বিমান হামলায় শুধু দুটি ভবনই ধসে পড়লো, পাশের ভবনগুলো দাঁড়িয়ে থাকলো, একটুও ক্ষতি হলো না, এটা কী সম্ভব?

বিমসান বিধ্বস্ত হলে মৃতদেহ পাওয়া গেলেও পেন্টাগনে আছড়ে পড়া বিমানের যাত্রীদের কোনো ছিন্নভিন্ন দেহ পাওয়া যায়নি। এমনকি বিধ্বস্ত বিমানের ছবিও দেখায়নি মার্কিন প্রশাসন। চারটি বিমানের একটিরও ব্ল্যাক বক্স পাওয়া বা উদ্ধারের কথা বলেনি হোয়াইট হাউস। এমনকি আজ পর্যন্ত পেন্টাগনে হামলার কোনো ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করা হয়নি। ৯০টি দেশের নিহতদের মধ্যে সব ধর্মের মানুষ থাকলেও কোনো ইহুদি মারা যায়নি। অথচ শুধু টুইন টাওয়ারেই এক হাজারের বেশি মানুষ কাজ করতেন বলে জানা গেছে। শুধু তাই নয়, হামলার ঠিক ৫ মিনিট আগে ইহুদিরা ওই ভবন থেকে বের হয়ে আসেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।