বারবার ফ্রান্সেই কেন হামলা!
ফ্রান্সে মুসলিমদের উপর অত্যাচারের নজির অনেকদিন থেকেই চলছে। ১৮৩০-১৯৬২ সাল পর্যন্ত আলজেরিয়ায় গণহত্যা চালিয়ে ১ মিলিয়ন মুসলিম হত্যার অভিযোগ রয়েছে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে।
বিংশ শতাব্দীতে অত্যাচারের মাত্রা কমলেও ফ্রান্সে মুসলিমদের হেয় প্রবণতা কমেনি। বিশ্বে মুসলিম নিধনের অভিযানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে ফ্রান্স। সিরিয়া ও ইরাকে ইসলামিক স্টেট (আইএস) যোদ্ধাদের নির্মূলে যৌথ বাহিনীর সাথে ফ্রান্স রয়েছে। ইয়েমেনেও মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটে ফ্রান্সকে দেখা যায়।
এসব কারণে বিশ্লেষকেরা বলছেন, দেশটির প্রতি ইসলামী চরমপন্থিদের বিদ্বেষও বেশি। মুসলিম হওয়ায় ফ্রান্সে বসবাসরত নারী-পুরুষকে হেয় করার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।
দেশটির বেশকিছু প্রকাশনাতে এই ধরনের কর্মকাণ্ড ছিল লক্ষণীয়। যেমন ২০০০ সালের পর থেকে ফ্রান্সের ব্যঙ্গাত্মক সাময়িকী ‘শার্লি এবদো’র মুসলিম সম্প্রদায়কে হেয় করে কার্টুন ছাপানো ছিল নিয়মিত ঘটনা। এ বিষয়ে সেখানকার মুসলিম কমিউনিটি প্রতিবাদ জানালেও সরকারের পক্ষ থেকে আন্তরিকতা দেখা যায়নি। বরং ফ্রান্সের স্কুল, অফিস আদালতসহ সর্বক্ষেত্রে নারীদের বোরকা পড়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। নিষেধাজ্ঞা রয়েছে হিজাব পড়া।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে মুসলমানদের সবচেয়ে প্রিয় এবং সম্মানীয় ব্যক্তি, আল্লাহর রাসুল হিসেবে পরিচিত হয়রত মোহাম্মদ (সা.) এর ব্যাঙ্গচিত্র ছাপানো হলে বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় ওঠে। বিশ্বের বেশকিছু দেশে ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীরা ফ্রান্সের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রসহ নানা প্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ ও হামলা চালায়।
শার্লি এবদোতে নতুন করে মহানবী (সা.) এর ছবি ছাপিয়ে ‘ঘৃণাকে উস্কে’ দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করে কাতার, বাহরাইন, জর্ডান, আলজেরিয়াসহ বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশ।
সেই মাসেই ফ্রান্সের ব্যঙ্গাত্মক সাময়িকী শার্লি হেবদো কার্যালয়ে সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। সন্ত্রাসীরা সাময়িকীটির কার্টুনিস্ট ও সাংবাদিক এবং দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ ১২ জনকে হত্যা করে। সে সময় একটি ইহুদী সুপারমার্কেটে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে প্রায় ১৭ জন নিহত হন।
ঘটনার পর বিশ্বের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সেখানেই শান্তি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে অংশ নেন বিশ্বের অধিকাংশ দেশের রাষ্ট্র নেতারাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
সন্ত্রাসী হামলার হুমকি থাকায় দেশটি সতর্ক থাকার পরও একই বছর কেঁপে ওঠে প্যারিস। নভেম্বর মাসের এক শুক্রবার সন্ধ্যায় প্যারিসের বাতাক্লঁ কনসার্ট হল, স্তাদে দে ফ্রান্স স্টেডিয়াম, রেস্তোরাঁ ও বারসহ সব মিলিয়ে ছয়টি স্থানে প্রায় একই সময়ে হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। বিস্ফোরণ ও গুলিবর্ষণের ধারাবাহিক ওই হামলায় অন্তত ১৩০ জন নিহত হন। পরদিন ওই হামলার তদন্তকালে সন্ত্রাসীদের গুলিতে এক নারী পুলিশ সদস্য নিহত হন।
ফ্রান্সের নিস শহরে জাতীয় দিবসের আলোকোৎসবে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় রাত ১১টার সর্বশেষ হামলার ঘটনায় আবারও প্রমাণিত হলো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছ থেকে কতটা হুমকির মুখে রয়েছে ফ্রান্স। দেশটির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাদও বিষয়টি মেনে নিয়েছেন।
ঘটনার পর সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, আমাদের সন্ত্রাসবাদের ভেতরেই টিকে থাকতে হবে। তবে এটাও জানিয়েছেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধ চলবেই। এজন্যে বিশ্বকে পাশে থাকার আহ্বান জানান তিনি।
হামলার পেছনের কারণ:
বহুদিন ধরেই প্যারিসসহ ফ্রান্সের অন্যান্য শহরের বেশ কিছু এলাকা ইসলামী চরমপন্থিদের উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ পশ্চিমাদের।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, মূলত দেশটিতে থাকা মুসলিম তরুণদের সমাজ বঞ্চনা ও বেকারত্বের শিকার হওয়ায় তারা জিহাদের দিকে ঝুঁকছে বেশি। ২০১৩ সালে ইসলামিক স্টেট বা আইএসের কার্যকলাপ যখন গণমাধ্যমের নজর কাড়ে তখন গোয়েন্দা তথ্যে বেরিয়ে আসে সেসময়ই সংগঠনটিতে ৫০০ জন ফরাসী যোগদান করেছে। আইএসের পক্ষ থেকেও বলা হয়, বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দলে যোগদান করেছে ফরাসিরা।
যারা ইরাক ও সিরিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের জিহাদিদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করছে। শুধু ফ্রান্সের নাগরিকই নয়, এই তালিকায় যোগ হতে দেখা যায় পশ্চিমা বেশ কিছু দেশের জনগণকে।
বিশ্লেষকেরা তখন বলেছিলেন, আল-কায়েদা কিংবা তালেবান গোষ্ঠীতে পশ্চিমা নাগরিকদের যোগদানের নজির না থাকলেও এই সংগঠনটিতে তা দেখা যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা সত্যি করেই সে বছর আবু বকর আল বাগদাদী ঘোষণা করেন, মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তির জন্য যারা দায়ী, সেই পশ্চিমারা এর ফল টের পাবে হাতেনাতে। যেভাবে তাদের নিরীহ জনগণকে হত্যা করা হয়েছে এবং হচ্ছে, সেই একই ফল তারাও হারে হারে উপলব্ধি করবে।
এর ঠিক পরপরই জঙ্গি হামলা মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। বিশেষ করে ৯/১১’র টুইন টাওয়ার হামলার পর এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ হামলার নজির দেখা দেয় পশ্চিমের দেশগুলোতে।
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা দেশগুলো থেকে মধ্যপ্রাচ্যে জিহাদে যোগ দিতে যাওয়া মানুষের মধ্যে ফ্রান্সের নাগরিকই সবচাইতে বেশি। তাদের সবচেয়ে বড় আশঙ্কা ছিল যে, পরিচয় গোপন করে যাওয়া এসব জিহাদীরা একসময় প্রশিক্ষণ শেষে নিজ দেশে ফিরে আসবে।
তারা বলেছিলেন, পশ্চিমা গোয়েন্দারা যদি তৎপরতা দেখাতে ব্যর্থ হয় তবে ফেরত আসা জিহাদী নামধারী সেই সব জঙ্গিরা নিজেদের দেশেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে। আর সেটি হলে মধ্যপ্রাচ্যের ন্যায় অশান্ত হবে পশ্চিমও। খবর- পরিবর্তন.কম


