English Version
আপডেট : ৭ জুলাই, ২০১৮ ১১:৪৮

সরকারের কাছে ৫ ব্যাংকের পাওনা ৩১ হাজার কোটি টাকা

অনলাইন ডেস্ক
সরকারের কাছে ৫ ব্যাংকের পাওনা ৩১ হাজার কোটি টাকা

ঋণের ভারে জর্জরিত দেশের বিভিন্ন সরকারি সংস্থা। বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে যাওয়া এসব রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংস্থাগুলোর কাছে সরকারি ৫ ব্যাংকের পাওনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে আবার খেলাপি হয়ে পড়েছে ২১৫ কোটি টাকা।

প্রতিবছরই এসব সংস্থায় ব্যাংকগুলোর বকেয়া ও খেলাপি ঋণ স্থিতি বাড়ছে। সদ্যপ্রকাশিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৮-তে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যে কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোনো সেক্টর সরকারি মালিকানায় থাকলে তাতে দুর্নীতি হবে-এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো গণতান্ত্রিক দেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ব্যবস্থাপনা পরিষদের পরিবর্তন হয়ে থাকে। এতে করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে না। এতে করে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারায় তো বটেই; পাশাপাশি সে প্রতিষ্ঠানের লোকসানের বোঝা সরকারকেই বহন করতে হয়। যার কারণে দেশের কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয় না।  অবশ্য লোকসানে পড়লে ন্যায়সঙ্গতভাবে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার পরিকল্পনার কথা জানান অর্থ প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান। তিনি বলেন, রাজনৈতিক কারণেই এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করছে না সরকার। সরকারি সংস্থার বিপুল ঋণের ভারে দাঁড়াতে পারছে না রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। আর অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনের আগে কাউকে হতাশ করতে চায় না সরকার। তবে নির্বাচনের পরে বড় ধরনের সংস্কার পরিকল্পনা আছে।    সমীক্ষার তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংকের কাছে সরকারি ৩০ সংস্থার বকেয়া ঋণ রয়েছে ৩১ হাজার ১৪৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপি পড়েছে ২১৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা। দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর নিকট সর্বোচ্চ বকেয়া রয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি)। চলতি বছরের জানুয়ারি শেষে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৩৫৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, যা ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১১ হাজার ৪৮৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা। দ্বিতীয়ত চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি)। এ সংস্থার কাছে বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫৮৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিএসএফআইসির কাছে ব্যাংকগুলোর বকেয়া ছিল ৪ হাজার ৪১৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।    এরপরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পাওনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ১৫১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল ৪ হাজার ১০৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) কাছে ব্যাংকগুলোর বকেয়া পাওনা ২ হাজার ৫৫২ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এর আগের বছরে বিএডিসি কাছে পাওনা ছিল ১ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা। বাংলাদেশ  কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) কাছে ব্যাংকগুলোর পাওনা রয়েছে ৩ হাজার ৮৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংকগুলোর পাওনা ছিল ২ হাজার ৬০৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা।  পরিসংখ্যানে কয়েকটি সংস্থার ঋণের পরিমাণ কমেছে। 

এর মধ্যে বাংলাদেশ জুটমিল করপোরেশনের (বিজেএমসি) বকেয়া কমে দাঁড়িয়েছে ৭৬১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, যা ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল ৮০০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে (বিডব্লিউডিবি) ব্যাংকগুলোর বকেয়া পাওনার পরিমাণ ছিল প্রায় ৬২৯ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের জানুয়ারিতে কমে হয়েছে ৬২৩ কোটি টাকা। পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি শেষে বাংলাদেশ মিনারেল অয়েল অ্যান্ড গ্যাস করপোরেশনের (বিওজিএমসি) কাছে ব্যাংকগুলোর পাওনা দাঁড়িয়েছে ৬৪৯ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল ৫৭৭ কোটি টাকা। এ সময়ে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) কাছে ব্যাংকগুলোর পাওনা দাঁড়িয়েছে ৯৪৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা, যা ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল ৪৫১ কোটি টাকা। এ ছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি শেষে ঢাকা ওয়াসার কাছে ৪৬০ কোটি, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) কাছে ১ হাজার ২৯ কোটি ৫৮ লাখ, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) কাছে সাড়ে ২১ কোটি ৯ লাখ, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কাছে ৩৩ কোটি ২২ লাখ, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) কাছে ৪৫১ কোটি ৬৪ লাখ ও বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (বিটিবি) কাছে ৪৩ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।  সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০১৮ সালের জানুয়ারি শেষে সর্বোচ্চ ১২৬ কোটি ৮১ লাখ টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে বিএসএফআইসির কাছে। এ ছাড়া বিএডিসির ২১ কোটি ২৭ লাখ, বিজেএমসির কাছে ১২ কোটি ৪৮ লাখ, বিসিআইসির কাছে ২০ কোটি ১৭ লাখ, বিটিএমসির কাছে ১১ কোটি, টিসিবির কাছে ১১ কোটি ও বিটিবির কাছে ১০ কোটি ৫২ লাখ টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে। এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের দক্ষতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি করতে না পারলে অপচয় হ্রাস পাবে না। তিনি বলেন, পাশাপাশি সরকার এসব প্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকি দিচ্ছে, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছেও প্রতিষ্ঠানগুলোর দায় দিন দিন বেড়েই চলছে। আর এসব সংস্থার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যর্থতার দুর্নামের ভাগিদার হচ্ছে। অপচয় ও দুর্নীতি রোধ করা গেলে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের এ সংস্থাগুলোকে লাভজনক করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।