বিএনপিতে এখন খালেদার অপেক্ষা
দীর্ঘ দুই মাস ধরে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া লন্ডনে অবস্থান করছেন। গত ১৫ জুলাই তিনি চোখ ও পায়ের চিকিৎসার জন্য লন্ডন যান। তার সফরের উদেশ্য চিকিৎসা হলেও আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দলের পরবর্তী কৌশল নিয়ে ছেলে তারেক রহমানের সরাসরি পরামর্শ গ্রহণও সফরের অন্যতম এজেন্ডা। আড়াই মাসের সফর শেষ করে চলতি মাসের ২৪-২৫ তারিখের মধ্যে দেশে ফিরতে পারেন বিএনপি চেয়ারপারসন। আগামী শনি ও রোববার শেষবারের মতো ডাক্তারের চেক আপে যাবেন তিনি। এরপরই ঠিক হবে, কবে দেশে ফিরবেন খালেদা জিয়া। লন্ডনের একটি সূত্র এমনটাই নিশ্চিত করেছে।
সফরে যাওয়ার আগে দলের জন্য বেশ কিছু কর্মসূচি রেখে গেলেও সবকিছুতেই ভাটা ভাব লক্ষ করা গেছে। বিশেষ করে দলের সদস্য সংগ্রহ অভিযানে লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে পারেনি দলটি। তবে দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন করতে না পারা জন্য সারা দেশের বন্যা পরস্থিতিকে দায়ী করছেন। বিভিন্ন ইস্যুতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সক্রিয় থাকলেও কাঙ্ক্ষিত নজর কাড়তে পারেননি। খালেদা জিয়া দেশে থাকতে নেতাদের মধ্যে যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যেত, তাতে অনেকটা ভাটা পড়ে আছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়েছে, খালেদার অপেক্ষায় বসে ছিল বিএনপির টপ টু বটম।
সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার দেশে ফেরার পরই বিএনপির রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হতে পারে। দলের সর্বশেষ সুচারু পুনর্গঠন, সহায়ক সরকারের রূপরেখা, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলসহ প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণের পর বিএনপির আইনগত করণীয়, কমন ইস্যুতে সমমনা দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা, আগামী নির্বাচনে শরিক দলের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি প্রসঙ্গসহ নিজ দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বার্তা নিয়ে দেশে আসছেন বিএনপিপ্রধান। এরআগে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে দলের বেশ কিছু সমস্যা চিহ্নিত করা হয়। এসব কারণে মনে করা হয়, দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত আসবে লন্ডন থেকে। তারেক জিয়ার পরামর্শেই দেওয়া হবে এসব সিদ্ধান্ত। দেশে ফিরে দলের এসব পরিকল্পনা আস্তে আস্তে বাস্তবায়নের পথে এগোবেন খালেদা জিয়া।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার লন্ডনের এ সফরকে অনেক গুরুত্ব দিচ্ছে দলের নেতাকর্মীরা। তারা মনে করছেন, খালেদা জিয়া দেশে ফেরার পরেই নতুন রূপে ফিরবে বিএনপি। অনেক বিষয়ে সংযোজন-বিয়োজন হবে দলের মধ্যে। নেত্রী আসার পরেই সহায়ক সরকারের রূপরেখা জাতির উদ্দেশে তুলে ধরবেন। সরকার যদি সেই রূপরেখা না মানে তবে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করা হবে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া লন্ডনে যাওয়ার পরে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করা হয়। এ নিয়ে দলটির সিনিয়র নেতারা সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং সরকারের পদত্যাগ দাবি করে। এরইমধ্যে রায়ের পর্যবেক্ষণ সামনে রেখে সরকারকে চাপের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৫৪টি আসনে বিনা ভোটে জয়ী হয়ে সংসদ গঠন করাকে অবৈধ দাবি করে মামলা করার পরিকল্পনাও আছে বিএনপিতে। এ ক্ষেত্রে দেশের খ্যাতনামা আইনজীবীকে ব্যবহারের কথাও শোনা যাচ্ছে।
তবে খালেদা জিয়ার লন্ডন সফর নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা সমালোচনার ঝড় তোলেন। অনেক নেতাই মন্তব্য করেন, মামলার ভয়ে খালেদা জিয়া দেশ ত্যাগ করেছেন। দেশে ফেরার আর কোনো সম্ভাবনা নেই। খালেদা জিয়ার দেশে ফেরা এবং সহায়ক সরকারের রূপরেখা নিয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দেশে ফেরার পরেই সহায়ক সরকারের রূপরেখা দেওয়া হবে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, দলের সর্বোচ্চ কাঠামো ঠিক থাকলে আশা করা যায় ম্যাডাম আসার পরেই সহায়ক সরকারের রূপরেখা দেবেন। এছাড়া তিনি (খালেদা জিয়া) আসার পরেই দলীয় বেশ কিছু সাংগঠনিক বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেবেন।
লন্ডন বিএনপির এক নেতা জানিয়েছেন, ২২, ২৩ অথবা ২৪ সেপ্টেম্বর দেশে ফিরতে পারেন বেগম খালেদা জিয়া। চলতি সপ্তাহে তাকে আবারও চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। চিকিৎসকেরা ছাড়পত্র দিলে এ মাসের শেষ সপ্তাহে তিনি দেশে ফিরবেন। এদিকে, ১২ সেপ্টেম্বর লন্ডনে খালেদা জিয়ার একটি সমাবেশ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। কবে হবে সে তারিখও ঠিক হয়নি। দেশে ফেরার আগে যে কোনো দিন তিনি নেতাকর্মীদের সঙ্গে মিলিত হতে পারেন বলে জানা গেছে।
বিদেশে অবস্থান করলেও দেশের রাজনীতির খোঁজখবর প্রতিনিয়তই রাখছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। দলের মহাসচিবের সঙ্গে প্রায় দিনই কথা হচ্ছে দলের চেয়ারপারসনের। দেশে বন্যার্ত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং রোহিঙ্গাদের সহযোগিতার নির্দেশনা তিনিই দিয়েছেন। দলের নেতাকর্মীরা বলছেন, বিএনপি এবার অনেকটা সুশৃঙ্খল পন্থায় বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। ত্রাণ কার্যক্রম ছিল উল্লেখ করার মতো। নির্বাচনের আগে বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টি দলের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে বলে তাদের মত।


