English Version
আপডেট : ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৫:২৯

ঢাকায় হেভিওয়েট প্রার্থী সংকটে বিএনপি

অনলাইন ডেস্ক
ঢাকায় হেভিওয়েট প্রার্থী সংকটে বিএনপি

রাজধানী ঢাকার নতুন সীমানায় বিএনপি সর্বশেষ নির্বাচন করেছে ২০০৮ সালে। সেই নির্বাচনের আগে বিএনপির প্রতিটি আসনে ছিল হেভিওয়েট প্রার্থীর ছড়াছড়ি। কিন্তু গেল দুটি নির্বাচনের একটিতে অংশ নেয়নি, অন্যটিতে যাদের প্রার্থী করা হয় তার অধিকাংশই ছিল নতুন মুখ। আগামী বছরের নির্বাচনে যেসব প্রার্থী ঢাকার আসনগুলোয় নির্বাচন করতে চান তাদের মধ্যেও হেভিওয়েট প্রার্থীর সংখ্যা কম। আলোচনায় থাকা মনোনয়নপ্রত্যাশীরা শক্তিশালী প্রার্থী হলেও কোনোমতেই হেভিওয়েট প্রার্থী নন বলে জানা যায়। বিএনপির সর্বাধিক পরিচিত নেতাদের মধ্যে দু-একজন ছাড়া বাকিদের নির্বাচনী অভিজ্ঞতা শূন্যের কোঠায়। সরকারি দলের নামকরা প্রার্থীদের বিপরীতে বিএনপি তেমন কোনো ভালো চমক দেখাতে পারছে না বলে সূত্রে আভাস পাওয়া যায়।

সবদিক বিবেচনায় আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ঢাকার নির্বাচনী আসনগুলোতে পাল্টে যেতে পারে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী তালিকা। বিগত নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের যোগ্যতা ও দুর্বলতাকে বিবেচনা করে এসব প্রার্থী বদল হবে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া অনেক নেতার মৃত্যু ও নিষ্ক্রিয়তার কারণেও এমন প্রার্থী সংকট বলে জানা যায়। তাই আগামী নির্বাচনেও বিএনপিকে তারকাবিহীন প্রার্থী নির্বাচন করতে হবে। তবে দলের অন্য একটি সূত্র জানায়, ঢাকার আসনগুলোতে তারকা প্রার্থীর সমাগম ঘটাতে শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করা হবে।

ঢাকা-৪ : নির্বাচন কমিশনের ২০১৩ সালের গেজেট অনুযায়ী, দক্ষিণ সিটির ৪৭, ৫১, ৫২, ৫৩ ও ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড এবং শ্যামপুর নিয়ে গঠিত ঢাকা-৪ আসন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বিএনপি বর্জন করেছিল। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেছেন মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল হাই। ওই নির্বাচনের আগে সংসদীয় সীমানা পুনর্বিন্যাসের কারণে ঢাকা মহানগরে ১০টি আসনের বদলে ১৫টি হয়। অন্যদিকে, মুন্সীগঞ্জে চারটি আসন থেকে একটি কমে তিনটি, ফলে মুন্সীগঞ্জ বিএনপির প্রভাবশালী নেতা আবদুল হাই মনোনয়ন পেলেও হন পরাজিত। এবার এ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক তানভীর আহমেদ রবীন। এর আগে তার পিতা সালাউদ্দিন এ আসনে এমপি হলেও পিতার আসনে ছেলে এবার শক্তিশালী একজন প্রার্থী। পরিচিত কোনো নেতা না থাকায় এবং তরুণ এ প্রার্থী হাই কমান্ডের নজর কাড়ায় তার মনোনয়ন অনেকটা নিশ্চিত বলে শোনা যায়।

ঢাকা-৫ : এ আসন থেকে ৯১ সাল থেকেই নির্বাচন করে আসছেন বিএনপির সিনিয়র নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ। ৯১, ৯৬ ও ২০০১ সালে এখান থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। আগামী নির্বাচনেও বিএনপির প্রার্থী আছেন তিনিই। এদিকে, এ আসনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অংশগ্রহণ করার কথা রয়েছে। তা সম্ভব না হলে সাবেক এমপি সালাউদ্দিন আহমেদ এ আসন থেকে মনোনয়ন নিয়ে লড়বেন। তবে, পিতা এবং পূত্র গুরুত্বপূর্ণ দুটি আসনে শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন দেওয়া হয় কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। তবে সালাউদ্দিন পরিবার থেকে যেকোনো একজনের নির্বাচন করার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত।

ঢাকা-৬ : ২০০৮ সালে এই আসনে নির্বাচন করেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি সাদেক হোসেন খোকা। ৯১ সালে তিনি এই আসনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে পরাজিত করেছিলেন। শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে বর্তমানে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। ইতোমধ্যে আদালত তাকে সাজা দিয়েছেন। তাই আইনি বাধ্যবাধকতায় তিনি আগামী নির্বাচন করতে পারবেন কি না তা নিশ্চিত নয়। তিনি নির্বাচন করতে না পারলে এই আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাশার। তবে ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন, খোকার অবর্তমানে তার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন এ আসন থেকে নির্বাচন করতে পারেন।

ঢাকা-৭ (লালবাগ) ২০০১ ও ২০০৮ সালে লালবাগ-চকবাজারের এই আসন থেকে নির্বাচন করেছেন বিএনপির অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতা নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু। ২০০৮ সালে এই আসনে পিন্টুর পাশাপাশি তার স্ত্রী নাসিমা আক্তার কল্পনাকেও মনোনয়নের চিঠি দেয় দল। তার অকাল মৃত্যুতে সহধর্মিণী ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহসভাপতি নাসিমা আক্তার কল্পনা এবার মনোনয়ন চাইবেন। পিন্টু পরিবার থেকে এই আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন তার ছোট ভাই নাসিম আহমেদ রিন্টুও। এর বাইরে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহসভাপতি মোশারফ হোসেন খোকন, সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রাসেল। তবে বিএনপির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ড. তুহিন মালিককে মনোনয়ন দিয়ে চমকও দেখাতে পারে বিএনপি।

ঢাকা-৮ : রমনা-মতিঝিল-শাহজাহানপুরের এই আসন বিএনপি স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য ও ঢাকা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি মির্জা আব্বাসের আসন। ২০০৮ সালে আইনি জটিলতায় নির্বাচন করতে না পারায় তখন নির্বাচন করেছিলেন বর্তমান ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল। সোহেল আগামীতেও এই আসন থেকে নির্বাচন করতে চান বলে তার ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন। তবে এই আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় আছেন দলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক আলী ফালুও।

ঢাকা-৯ (সবুজবাগ) আসন থেকে গত নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছিলেন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা। এ আসনে আওয়ামী লীগের সাবের হোসেন চৌধুরীর বিপরীতে ঢাকা মহানগর বিএনপি দক্ষিণের সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেল অথবা শিরীন সুলতানাকেই দেখা যাবে। তবে মির্জা আব্বাস তার সহধর্মিণী ও মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাসের জন্য মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। তবে কেউ কেউ বলছেন, ঢাকা-৮ ও ঢাকা-৯ এর মধ্যে একটিতে মির্জা আব্বাস এবং আরেকটিকে হাবিব-উন-নবী খান সোহেলও নির্বাচন করতে পারেন।

ঢাকা-১০ : ২০০৮ সালে ধানমন্ডির এ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমাদ। আগামী নির্বাচনে এ আসন থেকে বেশ কয়েকজন প্রার্থী দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। আলোচনায় আছেন দলের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসির উদ্দীন অসীম ও মহানগরের তরুণ নেতা রবিউল আলম রবি। এদের বাইরে জিয়া পরিবার-সংশ্লিষ্ট কেউ এই আসন থেকে নির্বাচন করতে পারেন বলেও অনেকে বলছেন।

ঢাকা-১১ : ২০০৮ সালে বাড্ডা-ভাটারার এ আসন থেকে নির্বাচন করেছিলেন বর্তমান ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সভাপতি এম এ কাইয়ুম। এবারও তিনি এ আসনে দলের একমাত্র প্রার্থী। তবে মামলা কিংবা অন্য কোনো কারণে নির্বাচন করতে না পারলে তার সহধর্মিণী শামীম আরা বেগমও উঠে আসতে পারেন মনোনয়ন তালিকায়।

ঢাকা-১২ : তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের এ আসন থেকে ২০০৮ সালে নির্বাচন করেছেন বর্তমান ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সহসভাপতি, ধনাঢ্য বাবসায়ী মো. সাহাবউদ্দিন। তিনি এবারও এ আসনে শক্ত মনোনয়ন প্রত্যাশী। তবে, এ আসন থেকে মনোনয়ন আশা করছেন যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুল ইসলাম নীরব। নোয়াখালীর ভোটার সমৃদ্ধ এ এলাকায় সেই ইজমের প্রার্থীর সম্ভাবনাই বেশি বলে শোনা যায়।

ঢাকা-১৩ : মোহাম্মদপুর-আদাবরের এই আসনে ২০০৮ সালের নির্বাচন করেছেন বিএনপির বর্তমান যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। এবার এ আসনে প্রার্থী বদল প্রায় নিশ্চিত। মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ঢাকার অন্য কোনো আসন থেকে নির্বাচন করতে পারেন। এ আসনে দলের হাই কমান্ডের পক্ষ থেকে মৌখিক নির্দেশনা পেয়ে গণসংযোগ শুরু করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম। মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন মহানগর উত্তরের সহসভাপতি আতিকুল ইসলাম মতিন ও সাবেক ছাত্রনেতা অ্যাডভোকেট জিল্লুর রহমান। জানা গেছে, বিএনপির হাইপ্রোফাইল এক নেতাকেও এ আসন থেকে প্রার্থী করা হতে পারে।

ঢাকা-১৪ : মিরপুর, শাহআলী, দারুস-সালাম নিয়ে গঠিত এ আসনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন এস এ খালেক। এবারও তিনি মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। তিনি না পেলে তার ছেলেকেও এ আসনে প্রার্থী দিতে পারেন তিনি। এ আসনে অন্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন মহানগর উত্তর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মুন্সী বজলুল বাসিত আনজু, মহানগর উত্তর বিএনপির সহসভাপতি রবিউল আউয়াল ও মহানগর উত্তর বিএনপির সহসভাপতি, সাবেক কমিশনার মাসুদ খান।

ঢাকা-১৫ : কাফরুলের এ আসনে ২০০৮ সালে নির্বাচন করেছেন উইং কমান্ডার হামিদুল্লাহ খান। এ আসন থেকে দলের যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল আগামীতে নির্বাচন করতে পারেন বলে তার ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন। যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন হাসানের নামও আছে আলোচনায়।

ঢাকা-১৬ : আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া। আগামী নির্বাচনে স্থানীয় ইজমের কারণে এ প্রার্থিতাও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। এক্ষেত্রে মহানগর উত্তর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক কমিশনার আহসান উল্লাহ হাসান, কেন্দ্রীয় বিএনপির ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক ও জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক রয়েছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীর তালিকায়।

ঢাকা-১৭ : গুলশান-ক্যান্টনমেন্টের এ আসনে ২০০৮ সালে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আ স ম হান্নান শাহ। এ আসন থেকে এবার দলের মনোনয়ন পেতে পারেন ভাইস চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) রুহুল আলম চৌধুরী। তবে শেষ পর্যন্ত এ আসন থেকে নির্বাচন করতে পারেন বিএনপির তরুণ নেতা উত্তরের মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল।

ঢাকা-১৮ : উত্তরা-খিলক্ষেত নিয়ে গঠিত এ আসনে ২০০৮ সালে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন দলের বর্তমান তথ্য বিষয়ক সম্পাদক, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আজিজুল বারী হেলাল। এবার এ আসনে প্রার্থী পরিবর্তন হতে পারে। এ আসনে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে প্রথমেই রয়েছেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মেজর (অব.) কামরুল ইসলাম। আরো আছেন যুবদল মহানগর উত্তরের সভাপতি এস এম জাহাঙ্গীর ও তরুণ ব্যবসায়ী নেতা মো. বাহাউদ্দিন সাদী।

তবে দলীয় সূত্র জানায়, ঢাকায় দলের হেভিওয়েট প্রার্থী সংকট কাটাতে ভিন্ন রকম চিন্তাও করছে বিএনপি। এর অংশ হিসেবে বেশ কয়েকজন নামকরা ব্যবসায়ী নেতাকে দেখা যেতে পারে ঢাকার প্রার্থী তালিকায়। এর বাইরে ২০ দলীয় জোটের শরিক নেতা ব্যারিস্টার আন্দালিব পার্থ, বিকল্পধারার মাহী বি চৌধুরী, মেজর (অব.) আবদুল মান্নান ও মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো প্রার্থীদের সঙ্গে মনোনয়ন ভাগাভাগি করতে পারে বিএনপি জোট।