জামায়াত নিষিদ্ধ করেন না কেন, সরকারের কাছে প্রশ্ন গয়েশ্বরের
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, সম্প্রতি গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার ঘটনায় সরকার যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা আছে- এখনো পর্যন্ত এমন কথা সরকার বা গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টরা বলতে পারেনি। জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণও তারা দেখাতে পারেনি। তারপরও জামায়াতকে ঢালাওভাবে জঙ্গিবাদের জন্য দায়ী করা হচ্ছে। সম্প্রতি একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে বিএনপির এ প্রভাবশালী নেতা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য, সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও জামায়াত বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন।
বিএনপির কেউ কেউ জাতীয় স্বার্থে জামায়াতকে ছাড়াই জাতীয় ঐক্যের কথা বলছেন, বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন? গয়েশ্বর: জাতির একমাত্র সমস্য যদি জামায়াতই হয় এবং এর বাইরে যদি কোনো সমস্যা না থাকে তাহলে এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া যায়। কিন্তু সমস্যাটা তো জামায়াত নয়। সমস্যা তো আরো অনেক। ঢালাওভাবে জামায়াতকে জঙ্গিবাদের জন্য দায়ী করা হচ্ছে কিন্তু সাম্প্রতিক যে দুটি ঘটনা ঘটলো সেখানে সরকারের তথ্য অনুযায়ী বা সরকার যতটুকু প্রকাশ করছে তাতে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা আছে তা তো তারা বলেনি। প্রমাণও দেখাতে পারেনি। রাজনীতির কারণে জামায়াতের সাথে যেমন শত্রুতাও হতে পারে, ঠিক তেমনি আবার মিত্রতাও হতে পারে। ঐক্যও হতে পারে আবার মতানৈক্যও হতে পারে। তাই আমি মনে করি জামায়াত কোনো সমস্য নয়। দেশে এর চেয়ে আরো বড় বড় অনেক সমস্য আছে।
সরকারি দলের নেতারা বলছেন জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির ঐক্যের ডাক অর্থহীন, এ প্রসঙ্গে আপনার মতমত কি? গয়েশ্বর: বেগম জিয়া কোনো শর্ত ছাড়াই জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এটা আমাদের জাতীয় সমস্যা। এব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে কে ক্ষমতায় আর কে ক্ষমতার বাইরে এটা দেখার বিষয় নয়। বেগম খালেদা জিয়ার এই আহ্বানের পরে তো নেতিবাচক আর কিছু থাকে না। সকলের ইচ্ছাই যদি এক হয় তাহলে বিএনপির আহ্বান তো সরকারকে সহযোগিতার করার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে। শুধু প্রশাসন দিয়ে তো হবে না। জনগণের কাছে যেতে হবে। জনগণকে সাথে নিয়েই এটাকে মোকাবেলা করতে হবে। আজকে জামায়াত যদি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মাঠে নামতে চায় তাহলে কি বলা যায়, আপনারা জঙ্গিবাদের সাথে থাকেন, আপনাদেরকে নেয়া হবে না।
সরকারকে বলি, জামায়াত নেতাদের যদি ফাঁসি দিতে পারেন, তাহলে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেন না কেন? এটাতো কঠিন কোনো কাজ নয়। সংসদে বিল উত্থাপন করে একদিনেই করতে পারেন। করেন না কেন? আর জামায়াত যদি রাজনৈতিক মেরুকরণের কোনো হাতিয়ার হয় আর সেই হাতিয়ার আওয়ামী লীগ ব্যবহার করলে যদি দোষ না হয় তাহলে আমরা ব্যবহার করলে দোষ হবে কেন? জামায়াত যদি রাষ্ট্রের জন্য অবৈধ অস্ত্র হয় তাহলে সরকার উদ্যোগ নিয়ে নিষিদ্ধ করে না কেন? আজকে আমি জামায়াতকে ফেলে দিলাম কিন্তু কালকে তারা (আওয়ামী লীগ) যে জামায়াতকে নেবে না এর গ্যারান্টি কী? বরং তারা জামায়াতকে নেবে এরই গ্যারান্টি আছে কারণ ইতিহাস তা বলে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে আপনার মতামত কী? গয়েশ্বর: স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধীতাকারীদের বিচার যদি অনেক আগেই হতো তাহলে তখন সঠিক তথ্য, সাক্ষ্য দেয়ার লোকের অভাব হতো না। মিছিল করে মানুষ সাক্ষ্য দিতে আসতো। এতো দিন পর বিচার হওয়ায় অনেক প্রত্যক্ষদর্শী মারা গেছে। সে কারণেই সরকারকে অনেকটা গোঁজামিল দিতে হয়। অনেক ঘটনা চাপা পরে গেছে। অনেক ঘটনা শেষ হয়ে গেছে। আবার অনেকে আত্মীয়তা বা দল পরিবর্তন করে পাপ মুক্ত হয়ে গেছে। সময় তো একটা বিষয়। যদি ৪০ বছর আগেই বিচারটা হত তাহলে আমরা অনেক আগেই পরিষ্কার থাকতাম। তখন এ দেশের কোনো মানুষ আপত্তি করতো না। যাদের স্বাধীনতাবিরোধী হিসাবে বিচার করা হচ্ছে, তাদের সঙ্গেও তো বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ছবি আছে। বিভিন্ন পত্রিকায় বৈঠকের ছবি আছে। এটা তো অস্বীকার করার কিছু নাই এবং তারাই প্রথম তাদের হাতে এদেশের পতাকা তুলে দিয়েছে। অতএব বলা যায়, বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে রাজনীতিতে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন ঘটে। রাজনীতিতে চির শত্রু, চির মিত্র বলে কিছু নেই।
রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াত নিয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী? গয়েশ্বর: বর্তমানে জামায়াতের ৭০ ভাগ নেতাকর্মী আছে ১৯৭১ সালে যাদের জন্মই হয়নি। সুতরাং কোনো রাজনৈতিক দলে যদি কোনো দোষী ব্যক্তি থাকে তাহলে তার বিচার হওয়া আর রাজনৈতিক দলটিকে নিষিদ্ধ করা এক কথা নয়। জামায়াতের পূর্ব ইতিহাস আছে।
জামায়াত কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির বিপক্ষে ছিলো। পাকিস্তান যখন সৃষ্টি হলো তখন জামায়াতকে কিন্তু নিষিদ্ধ করা হয়নি। বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে রাজনীতিতে বিভিন্ন ধরনের গতি পরিবর্তন হয়। জনগণের আকাঙ্ক্ষার ফলে রাজনীতির প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়। অনেকে অভিযোগ করে বলেন, জামায়াতের গাড়িতে স্বাধীনতার পতাকা দেওয়া হয়েছে কেন? তাহলে আমি বলবো, জামায়াত যদি স্বাধীনতাকে বিশ্বাস না করে থাকে তাহলে এখানে আমার প্রশ্ন তারা গাড়িতে পতাকা নেবে কেন? ৭১-এ কেউ যদি স্বাধীনতাবিরোধী হয় তাহলে তার জন্য অবশ্যই শাস্তির প্রয়োজন আছে। কিন্তু এর জন্য পুরো দলটাকে বাদ দেয়া যায় না। এমন তো না যে, ৭১-এ যারা স্বাধীনতা বিরোধী আছে তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের কোনো নেতা নেই। কারণ আমাদের দেশে রাজনীতিতে স্বাধীনতা আছে। এখানে একটা পরিবারের ৫টা লোক ৫টা দল করতে পারে। সে কারণে আমি বলব, এখানে ব্যক্তি অপরাধী হলে, ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে হবে। ব্যক্তির অপরাধের জন্য একটা দলকে নিষিদ্ধ করা যায় না।
দেশে সম্প্রতি জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার কী কারণ থাকতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
গয়েশ্বর: যখন গণতন্ত্রের পথ সংকুচিত হয় তখন গণতান্ত্রিক শক্তিগুলি কোনপথে চলে? এদের মধ্যে সকলে উদারপন্থি থাকে না। এর মধ্যে কিছু কঠোর পন্থিও থাকে। কিছু ইয়াং জেনারেশন বুকে যন্ত্রণায় ভোগে। তারা তখন মনে করে যে, তার দল কিছু করছে না। তখন সে যদি অন্য পথে চলে যায় তখন তাকেতো আর আটকে রাখা যায় না। সুতরাং গণতন্ত্র যেখানে অনুপস্থিত থাকবে। গণতন্ত্রের চর্চা যেখানে সংকুচিত হবে; সেখানে এই ধরনের উপসর্গ দেখা দিবেই। এটা রাষ্ট্র বিজ্ঞানের কথা। সেকারণেই এই পথগুলোর সৃষ্টি হয়। আমার মনে হয় এখনো এই শক্তি এতোটা বিস্তার লাভ করেনি। এদের মধ্য সমন্বয়টা এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি।


