’জামায়াত চলে যাবে, না গেলে বেগম জিয়া শক্ত সিদ্ধান্ত নেবেন’
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ছাড়া প্রসঙ্গে নমনীয় মনোভাব দেখিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী ও দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে গত কয়েকদিনের বৈঠকে তার এ মনোভাব দেখা গেছে। খালেদা জিয়ার সঙ্গে এই বৈঠকগুলোয় অংশ নেওয়া স্থায়ী কমিটির সদস্য, বুদ্ধিজীবী ও কয়েকজন পেশাজীবী নেতা এমনটাই জানিয়েছেন।
কয়েক বছর ধরে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত দলটির সঙ্গ ছাড়ার জন্য বিভিন্ন মহল চাপ দিয়ে আসছিল বিএনপিকে। এতদিন অনড় মনোভাব দেখালেও দলটির শীর্ষ পর্যায় থেকে এবার নমনীয় মনোভাবের ইঙ্গিত পাওয়া গেল।
বৈঠকে উপস্থিত থাকা কয়েকজন জানান, জামায়াত ইসলামীর সঙ্গ ছাড়ার চাপ দিন দিন বেড়েই চলছে। সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার ঘটনায় খালেদা জিয়ার জাতীয় ঐক্যের আহ্বানে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জামায়াত। কারণ হিসেবে তারা বলেন, সরকার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে জামায়াত ছাড়লে জাতীয় ঐক্য সম্ভব। এই পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় ঐক্য ও গণতন্ত্রের স্বার্থে জামায়াতকে ছাড়তে প্রস্তুত বিএনপি। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারকে অবস্থান আরো পরিষ্কার করতে হবে।
এ বিষয়ে বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য যা করার দরকার বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তাই করবেন। জামায়াত ছাড়ার ব্যাপারে খালেদা জিয়া শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। তাছাড়া বর্তমানে জামায়াতের নেতৃত্বে যারা আছেন মোটামুটি সবাই স্বাধীনতার পরের প্রজন্ম। এখন যদি জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের প্রয়োজন হয়, তারাই (জামায়াত) তো সরে যেতে পারে। তারা যদি মনে করেন সরে গেলে জাতির জন্য মঙ্গলজনক বা কল্যাণকর হবে, তারাই সরে যাবেন।’
রাজনৈতিক ঐক্য ভঙ্গে খালেদা জিয়া ও জামায়াতের আনুষ্ঠানিক কোনো বৈঠক হয়েছে কি-না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আলোচনা হচ্ছে। তবে বৈঠক হয়নি। সামনে হবে। কয়েকদিন ধরে এ ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। দেশের স্বার্থে যা করা দরকার খালেদা জিয়া তা-ই করতে প্রস্তুত।’
সরকার থেকে বলা হচ্ছে জামায়াত না ছাড়লে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা নয়- এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সরকারের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াও তো জাতীয় ঐক্য হতে পারে। কারণ তারা (সরকার) কী বলছে, কী শর্ত দিচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে খালেদা জিয়া জাতীয় ঐক্যের ডাক দেননি। ডাক দিয়েছেন জাতীয় স্বার্থে।’
ড. এমাজউদ্দিন বলেন, ‘আমি আবারো পরিষ্কার করে বলছি জামায়াত অনুভব করে যে, তারাও এই দেশের লোক। জাতীয় স্বার্থ যদি ডিমান্ড করে তারাই (জামায়াত) চলে যাবে। আর না গেলে বেগম জিয়া শক্ত অবস্থানে থেকেই সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি তো এত দুর্বল নারী নন।’
রাজধানীর গুলশানে জঙ্গি হামলার পর সরকারকে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জামায়াতের সঙ্গ ছাড়লেই কেবল বিএনপির সঙ্গে জাতীয় ঐক্য সম্ভব। এ ব্যাপারে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গ না ছাড়লে বিএনপি যতোই চেষ্টা করুক আলাপ-আলোচনা বা ঐক্য- কোনোকিছুই সম্ভব নয়।’
তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে আমরা যেমন ঐক্যবদ্ধ ছিলাম ঠিক তেমনিভাবে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে এখন জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছে। দেশের সকল সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ এই ঐক্যে শামিল হয়েছেন, একমাত্র বিএনপি-জামায়াত ছাড়া। এদের সঙ্গে জাতীয় ঐক্য সম্ভব নয়।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপিপন্থী এক পেশাজীবী নেতা বলেন, ‘জঙ্গিবাদ বিরোধী জাতীয় ঐক্যর ক্ষেত্রে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া পিছপা হবেন না। এ জন্য ক্রমান্বয়ে স্থায়ী, জোট, বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি। বৈঠকে জামায়াত ইস্যুতে মোটামুটি সবাই একমত হয়েছেন যে, যেহেতু এ মুহূর্তে সরকার জামায়াতকে জাতীয় ঐক্যের ব্যাপারে প্রধান বাধা হিসেবে মনে করছে, তাই বিএনপি মনে করে জামায়াত ছাড়া যদি জাতীয় ঐক্য, গণতন্ত্র ও সর্বোপরি দেশে শান্তি ফিরে আসে তাহলে জামায়াতকে বিএনপি ছাড়তে প্রস্তুত। তবে সরকারকেও এখানে শর্ত দিতে হবে যে, বিএনপি জামায়াত ছাড়লে তারা (সরকার) তাদের দলে ভেড়াবে না।’
আরো এক নেতা বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বৈঠকে (বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবী) উপস্থিত সবাইকে বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের আদর্শগত কোনো মিল নেই। এটা মূলত নির্বাচন কেন্দ্রিক জোট। তবুও যেহেতু এখানে জাতীয় স্বার্থ রয়েছে তাই তিনি (খালেদা) বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখবেন।’
এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। তবে এ ব্যাপারে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারব না। দুঃখিত কিছু মনে করবেন না।’
বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘জামায়াত ছাড়ার ব্যাপারে দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। তাছাড়া গত কয়েকদিনে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে জামায়াত ছাড়ার ব্যাপারে আমি সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলতে পারব না। এখানে সরকারকেও তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে।’
সরকারকে কী পরিষ্কার করতে হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সরকারের ভরকেন্দ্র থেকে এ ব্যাপারে কোনো কিছু বলা হয়নি। মন্ত্রী, এমপিরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিজেদের মতো করে কথা বলছেন। এটা তো কোনো প্রস্তাব হতে পারে না। আমরা প্রস্তাব দিয়েছি, তারাও এ ব্যাপারে পরিষ্কার করে প্রস্তাব দিলেই চলমান সংকট সমাধান হবে বলে আমি মনে করি।’
সূত্র জানায়, জাতীয় ঐক্যের আহ্বানের পর সরকার দলীয় পক্ষ থেকে জামায়াত ইস্যুতে যেসব আলাপ-আলোচনা হচ্ছে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নিজে তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। সে লক্ষ্যে ইতোমধ্যে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন, আরো করবেন। তাছাড়া জামায়াত ইস্যুতে ঈদের পর বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে খালেদা জিয়া দীর্ঘসময় টেলিফোনে কথা বলেছেন। তারেক রহমানও জামায়াত ছাড়ার ব্যাপারে কিছুটা সাড়া দিয়েছেন। সে অনুযায়ী খালেদা জিয়া জামায়াত ইস্যুতে কিছু টিম গঠন করেছেন। তারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দলীয়ভাবে এ ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করছেন।
২০০১ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয় বিএনপি। ওই বছর জাতীয় নির্বাচনে ব্যাপক সাফল্য পায় দলটি। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র ভোট সমান হলেও শরিকদের ভোট যোগ হওয়ায় সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ধরাশায়ী করে বিএনপি। পরবর্তীতে জামায়াত থেকে একাত্তরের আলবদর নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রী হন।
জামায়াতের স্বাধীনতাবিরোধী দুই চিহ্নিত নেতাকে মন্ত্রিত্ব দিয়ে সমালোচনায় পড়ে বিএনপি। তাছাড়া চারদলীয় জোট ক্ষমতায় থাকাকালীন জামায়াত নেতাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য ও আচরণে বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার দাবি ওঠে নানা মহল থেকে। বিশেষ করে দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরুর পর থেকে তা আরো জোরালো হয়ে ওঠে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে একাধিক নেতা খালেদা জিয়াকে জামায়াত ছাড়ার পরামর্শ দেন বলেও জানান দলটির নেতারা। কিন্তু বিএনপি বরাবরই দাবি করে আসছে, জামায়াতের সঙ্গে তাদের জোট শুধুই রাজনৈতিক।


