English Version
আপডেট : ১৪ জুন, ২০১৬ ০৪:৩৭

জঙ্গি অর্থায়নে জব্দ ৩০ ব্যাংক হিসাব

অনলাইন ডেস্ক
জঙ্গি অর্থায়নে জব্দ ৩০ ব্যাংক হিসাব

জঙ্গি সংগঠনে অর্থায়নের সন্দেহে আট বাণিজ্যিক ব্যাংকের ৩০টি হিসাব জব্দ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগ হিসাবগুলোতে সন্দেহজনক লেনলেদেনের প্রমাণ পেয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ২০০৯-এর ১৫(১)(খ) ধারায় ব্যাংক হিসাবগুলো স্থগিত করা হয়।  এর মধ্যে সিরিয়ায় মার্কিন জোটের বিমান হামলায় নিহত আইএসের প্রধান হ্যাকার সাইফুল হকের (সুজন) দুটি ব্যাংক হিসাব রয়েছে। বাকি হিসাবগুলো সাইফুলের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের ৬টি দেশ থেকে ব্যাংক হিসাবগুলোতে বিপুল অংকের টাকা এসেছে। এ অর্থ কোথায় দেয়া হয়েছে তা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো খতিয়ে দেখছে। খবর যুগান্তর'র।

সূত্র জানায়, জব্দ ব্যাংক হিসাবগুলো নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটসহ (বিএফআইইউ) দুটি গোয়েন্দা সংস্থা। তদন্তের স্বার্থে আন্তর্জাতিক সংস্থা এগমন্ড সিকিউরড ওয়েব’ও (ইএসডব্লিউ) কাছে এসব ব্যাংক হিসাবে অর্থ প্রেরণকারীদের সার্বিক তথ্য চেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন কি উদ্দেশ্যে এসব টাকা পাঠানো হয়েছিল দেশগুলোর আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের মাধ্যমে এসব তথ্য চাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে পাওয়া গেছে এ তথ্য।

এ প্রসঙ্গে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের সঙ্গে কোনো আপস নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত প্রসঙ্গে আমার জানা নেই। তবে এ ঘটনায় বিদেশ থেকে টাকা এসে থাকলে ওই টাকা দিয়ে কারা সুবিধা নিয়েছে তাদের খুঁজে বের করা হবে। এর থেকে কেউ রক্ষা পাবে না। শক্ত হাতে তাদের দমন করা হবে। এক্ষেত্রে সহানুভূতি দেখার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ৩৭টি ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ৭টি অবমুক্ত করে দেয়া হয়। বাকি ৩০টি হিসাব আমলে নিয়ে তদন্ত শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।  ২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত তদন্তের স্বার্থে ওইসব ব্যাংক হিসাব স্থগিতের মেয়াদ চার দফা বাড়ানো হয়। এসব ব্যাংক হিসাব নিয়ে আলাদা তদন্তের জন্য ২৫ এপ্রিল বিএফআইইউ থেকে সিআইডির কাছে পাঠানো হয়। পাশাপাশি আরও অধিকতর তদন্তের স্বার্থে ১৫ মে এসব ব্যাংক হিসাব পাঠানো হয় পুলিশের ডিটেকটিভ ব্র্যাঞ্চের (ডিবি) কাছে।

জানা গেছে, মার্কিন জোটের বিমান হামলায় ১০ ডিসেম্বর সিরিয়ায় আইএসের প্রধান হ্যাকার বাংলাদেশী নাগরিক সাইফুল হক নিহত হন। এর দুই সপ্তাহ আগে ব্রিটিশ গোয়েন্দা তার সম্পর্কে বাংলাদেশকে অবহিত করে। তারাই  জানায়, ঢাকার কারওয়ান বাজারে সাইফুল হকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ দুই প্রতিষ্ঠানসহ আরও বেশ কিছু সংস্থার মাধ্যমে জঙ্গি অর্থায়ন হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আইব্যাকস লিমিটেড এবং আইব্যাকস টেলি ইলেকট্রনিকস লিমিটেড। দুই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ পাঠানো হতো জিহাদি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য। এরপর বাংলাদেশের একটি গোয়েন্দা সংস্থা ঢাকার কারওয়ান বাজারে আইব্যাকস কার্যালয় এবং এর কর্মীদের ওপর শুরু করে নজরদারি। ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত সাইফুলের বাবা আবুল হাসনাত, ছোট ভাই হাসানুল হক ওরফে গালিব মাহমুদ, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক ও সাইফুলের শ্যালক তাজুল ইসলাম (শাকিল), হিসাবরক্ষক নাহিদউদ্দোজা মিয়াসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাদের কাছ থেকে ৩৮ লাখ ৮৬ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের অভিযোগ এনে রাজধানীর তেজগাঁও থানায় মামলা দিয়েছে পুলিশ (মামলা নং-২১, তারিখ ০৯.১২.১৫)।

থানায় এ মামলার এজাহারে বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদে আবুল হাসনাত পুলিশকে বলেছেন, তার দুই ছেলে সাইফুল হক ও আতাউল হক প্রবাসে থাকেন। তারা বিদেশ থেকে মতিঝিলের একটি মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে আইব্যাকসের নাহিদউদ্দোজা মিয়ার কাছে অর্থ পাঠায় জিহাদি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য। তারা একে অপরের সঙ্গে থ্রিমা ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং অ্যাপলিকেশনের মাধ্যমে যোগাযোগ করতেন। সাইফুলের বাবা-ভাই, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক ও হিসাবরক্ষক গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে ঢাকার কারওয়ান বাজারে একটি বহুতল ভবনে অবস্থিত আইব্যাকস কার্যালয় বন্ধ রয়েছে। পুলিশ এসে তালা ভেঙে কার্যালয়টি তল্লাশি করে এবং কিছু সরঞ্জাম মামলার আলামত হিসেবে নিয়ে গেছে বলে জানা গেছে। এরপর পুলিশ দরজায় একটি তালা মেরে যায়।

সূত্র জানায়, ২০১২-১৫ সাল পর্যন্ত ঢাকার আইব্যাকস লিমিটেড এবং আইব্যাকস টেলি ইলেক্ট্রনিকস লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠান দুটির ব্যাংক হিসাবে এফটিটির মাধ্যমে ২ কোটি ২২ লাখ টাকা জমা হয়েছে। টাকা এসেছে ব্রাজিল, সাউথ আফ্রিকা, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সুরিনাম ও স্পেন থেকে। জানা গেছে, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ও মেইন্টেন্যান্স চার্জ হিসাবে এসব অর্থ প্রেরণ দেখানো হয়েছে। বিদেশী রেমিটেন্স ছাড়াও ওই হিসাব দুটিতে বিভিন্ন সময়ে নগদ অর্থ জমার সন্ধান পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এফটিটি ও নগদ জমার একটি বড় অংশই নগদে উত্তোলন করা হয়েছে।

জানা গেছে, সাইফুলের ব্যাংক হিসাব দুটি থেকে অধিকাংশ সময় নাহিদউদ্দোজ্জা মিয়ার মাধ্যমে নগদ লেনদেন হয়। এছাড়া মো. আতাউল হক, জাহাঙ্গীর, মো. মশিউর রহমান, মো. আনিসুর রহমান, মামুনুর রশিদ, আবুল হাসনাত, মাহবুবুল হক, কালাম, মুন্না, হোসেন আহমেদ, মিঠু, মাহি, মো. অলি, মো. আবু হানিফ, অজিত বাবু, মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম নামের ব্যক্তিরা সাইফুল হকের ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করেছেন। তবে যারা টাকা তুলেছেন তাদের বিদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত বা হিসাব পরিচালনা সংক্রান্ত কোনো তথ্য পায়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। উল্লেখিত ব্যক্তির নাম ছাড়া অন্য কোনো ঠিকানা এখন পর্যন্ত সংগ্রহ করতে পারেনি সংস্থাগুলো।

দেশের তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক সংগঠনগুলোর সমিতি বেসিসের সদস্যপদ (জি-২৮৭) নিয়ে বাংলাদেশে পরিচালিত হয়েছে আইব্যাকস লিমিটেড। এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হলেন আতাউল হক। ২০০৫ সালে সাইফুলের গড়া আইব্যাকসের ওয়েবসাইটে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের বাইরে ঢাকা, ডেনমার্ক, অস্ট্রেলিয়া, জর্ডান ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম ছিল। কার্ডিফে এর প্রধান কার্যালয়। ঢাকা ও জর্ডানে আলাদা অফিস রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি মূলত খাবারবিষয়ক বিভিন্ন পোর্টাল আর ভ্যাট-ট্যাক্স এবং জিপিএস-জিপিআরএস প্রযুক্তি সহায়ক অ্যাপস তৈরির কাজ করেছে।