বিএনপিকে চাপে রাখার কৌশল
বিএনপির কূটনৈতিক তৎপরতার সাথে পরোক্ষভাবে জড়িত প্রবীণ সাংবাদিক শফিক রেহমানকে গ্রেফতার, দলের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুককে যুদ্ধাপরাধের সাথে জড়ানোর চেষ্টা এবং সরকার উৎখাতের উদ্দেশ্যে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সাথে গোপন যোগাযোগের অভিযোগে যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীকে আটকের ঘটনা বিএনপিকে চাপে ফেলানোর কৌশল হিসেবে নিয়েছে সরকার। এক মাসের মধ্যে পরপর এই তিনটি ঘটনা বিএনপিকে অবাকও করেছে। যেসব অভিযোগ দলের গুরুত্বপূর্ণ এই তিন নেতার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে, সে সম্পর্কে দলটির হাইকমান্ডের কাছে আগে থেকে কোনো ধারণাই ছিল না। শীর্ষ নেতারা বলেছেন, দল গুছিয়ে সামনের দিকে এগোতে থাকা বিএনপিকে ঘায়েল করতেই সরকার ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। এমন সব অভিযোগ তারা দলের তিন নেতার বিরুদ্ধে এনেছে, যা অভিনব ও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। গত ১৫ এপ্রিল রাজধানীর ইস্কাটনের বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় সাংবাদিক শফিক রেহমানকে। সরাসরি বিএনপির রাজনীতি না করলেও তিনি বিএনপির বৈদেশিক যোগাযোগের দিকটি দেখভাল করতেন। প্রবীণ এই সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ ও হত্যা চেষ্টার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে। শফিক রেহমানের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে বিএনপি। দলটি বলেছে, যে অভিযোগে শফিক রেহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে এ সংক্রান্ত মামলার নথিতে তার কোনো উল্লেখ নেই। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইকে ঘুষ দেয়ার চেষ্টা সংক্রান্ত ওই মামলা ২০১৫ সালেই বাতিল হয়ে গেছে। বিএনপির একাধিক নেতা বলেছেন, সরকারের টার্গেট হলো বিএনপির কূটনৈতিক তৎপরতা নস্যাৎ করে দেয়া। আর সেই উদ্দেশ্যেই শফিক রেহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শফিক রেহমানকে গ্রেফতারের পর বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুকের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ পাওয়ার কথা জানান ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক সানাউল হক। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের এই কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত করতে গিয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহের ১১ জন প্রফেসরের নাম পাওয়া গেছে, যারা স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকাণ্ড করেছেন। এই ১১ জনের বেশির ভাগই সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক বা কর্মকর্তা ছিলেন। তাদের মধ্যে ড. ওসমান ফারুকের নামও রয়েছে। ওসমান ফারুক তখন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রিকালচার ইকোনমি অনুষদের প্রফেসর ছিলেন। ওই তালিকা ধরে তদন্ত সংস্থা অভিযোগের প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে। ড. ওসমান ফারুকও বিএনপির কূটনৈতিক তৎপরতার সাথে যুক্ত। মার্কিন প্রশাসনের সাথে তার ভালো যোগাযোগ রয়েছে বলে জানা যায়। ওসমান ফারুকের বিরুদ্ধে নতুন এই অভিযোগের পেছনে রাজনৈতিক কলাকৌশল রয়েছে বলে মনে করছে বিএনপি। দলটির নীতিনির্ধারকদের মতে, বিএনপির কূটনৈতিক তৎপরতাকে ব্যাহত করার টার্গেট নিয়েছে সরকার। কূটনীতিক রিয়াজ রহমানের ওপর হামলার মধ্য দিয়ে এই পর্ব শুরু হয়েছে। শমসের মবিন চৌধুরী জেল থেকে বেরিয়ে দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। শফিক রেহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ড. ওসমান ফারুকের বিরুদ্ধে স্পর্শকাতর অভিযোগ তোলা হয়েছে। তাদের মতে, রিয়াজ রহমান থেকে ড. ওসমান ফারুক পর্যন্ত পুরো বিষয়টি সরকারের পরিকল্পনার অংশ। সর্বশেষ গত ১৫ মে গ্রেফতার করা হয় বিএনপির নতুন যুগ্ম মহাসচিব লায়ন আসলাম চৌধুরীকে। তার বিরুদ্ধে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়। গত ৯ মে নয়াদিল্লিতে ইসরাইলের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল ডিপ্লোমেসি অ্যান্ড অ্যাডভোকেসির প্রধান ও লিকুদ পার্টির নেতা মেন্দি এন সাফাদির সাথে একটি অনুষ্ঠানে আসলাম চৌধুরীর উপস্থিতির সংবাদ সম্প্রতি সচিত্র প্রকাশিত হয় গণমাধ্যমে। এই অনুষ্ঠানে আসলাম চৌধুরীর অংশগ্রহণকে সন্দেহ করছে সরকার। সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সাথে গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র করছিলেন চট্টগ্রাম বিএনপির এই নেতা। আসলাম চৌধুরী গ্রেফতার হওয়ার আগে গণমাধ্যমকে অবশ্য বলেছেন, ভারতে ব্যবসায়িক সফরে গিয়ে একটি ট্যুরিস্ট বাসে লোটাস টেম্পলে যাওয়ার সময় বাংলাদেশের শিপন কুমার বসুর সাথে তার পরিচয় হয়। শিপন সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে কাজ করেন জানতে পেরে তার সাথে বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও নির্যাতনের বিষয়টি নিয়ে তিনি আলাপ করেন। এসব আলাপচারিতায় তার সাথে ভালো সম্পর্ক হয়ে যায়। তিনি একদিন একটি অনুষ্ঠানে নিয়ে যান। সেখানে আমি দর্শক সারিতে বসা ছিলাম। তেল আবিব-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে অনুষ্ঠিত ওই সেমিনারের শেষে চা-চক্রের পরে গ্রুপ ছবি তোলা হয়। শিপন আমাকে দর্শক সারি থেকে স্টেজে নিয়ে যান। আমি তখনো জানি না অনুষ্ঠানে উপস্থিত মেন্দি এন সাফাদি ইসরাইলের লিকুদ পার্টির নেতা। তিনি বলেছেন, আমি ষড়যন্ত্রের শিকার। কারো ফাঁদে পা দিয়েছি। এ ঘটনার সাথে দলের কোনো যোগসূত্র নেই। বিষয়টি সরকার রাজনীতির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। এ ঘটনায় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ভারতে বিএনপির একজন লোক গিয়ে বাংলাদেশ সরকারের উৎখাতে ষড়যন্ত্র করবে এটা হাস্যকর ছাড়া কিছু হতে পারে না। সরকার পতনের শেষ প্রান্ত এসে পৌঁছেছে। সেখান থেকে উত্তরণের জন্য ভিন্ন কৌশলে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করতেই তারা ইসরাইল, ইসরাইল বলে বেড়াচ্ছে। বিএনপি স্থায়ী কমিটির একজন নেতা বলেছেন, সরকার বিএনপিকে চাপে রাখতে এবং বিব্রত করতে একেক সময় একেক কৌশল নিচ্ছে। তারা বিএনপিকে নিঃশেষ করে দিতে চায়। সূত্র-নয়া দিগন্ত


