English Version
আপডেট : ১০ মে, ২০১৬ ১৯:০৯

যেকোন সময়ে নিজামীর ফাঁসি

এমএজামান
যেকোন সময়ে নিজামীর ফাঁসি

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা না চাওয়ায় ফাঁসি কার্যকর হতে পারে যেকোনও সময়ই। ফাঁসি কার্যকরের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছে কারা কর্তৃপক্ষ।

মঙ্গলবার (১০ মে) রাতেই যেকোনও সময় ফাঁসি কার্যকর হতে পারে বলে জানিয়েছে কারাসূত্র। তারা বলছেন, রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষায় আগ্রহ না দেখানোয় ফাঁসির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনা) আবেদন খারিজের পর কাশিমপুর কারাগারে তার পরিবারের সঙ্গে শেষ সাক্ষাতেও নিজামী প্রাণভিক্ষা না চাওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন। তার পরিবারের বরাত দিয়ে আইনজীবী তাজুল ইসলাম বলেন, তিনি বলেছেন, জীবন-মৃত্যুর মালিক আল্লাহ।

কারও কাছে তিনি প্রাণভিক্ষা চাইবেন না। পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎসহ আর কোনও আনুষ্ঠানিকতা হবে কিনা সেটি কারাকর্তৃপক্ষ ঠিক করবেন।

এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছেন, নিজামী প্রাণভিক্ষা চাননি। ফলে ফাঁসি কার্যকর এখন সময়ের ব্যাপার।

তবে নিজামীর ফাঁসি কার্যকরে সরকার সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। ফাঁসি কার্যকরের জন্য যেসব প্রস্তুতি প্রয়োজন, সেসব চলছে। এখন অপেক্ষা করুন, দেখতে পাবেন।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যে তাদের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। কাশিমপুর কারাগার থেকে কেন্দ্রীয় কারাগারে এসে পৌঁছেছে প্রধান জল্লাদ রাজুও। রাত ১০টার পর যে কোনও সময় ফাঁসি কার্যকর করা হবে।

ইতোমধ্যে নিজামীর শারীরিক পরীক্ষার জন্য চিকিৎসক আনা হয়েছে। বর্তমানে নিজামীকে কেন্দ্রীয় কারাগারের রজনীগন্ধা সেলের ৮ নম্বর কক্ষে রাখা হয়েছে।

মঙ্গলবার সকালে নাজিমুদ্দিন রোডের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে দেখা যায়, কারাগারের চারপাশে র‌্যাব, পুলিশ ও কারারক্ষীর সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সাদা পোশাকে কারাগার এলাকায় অবস্থান নিয়েছেন। কারাগারের প্রধান ফটকে গণমাধ্যমকর্মীদের ভীড়ও বেড়েছে।

কারা সূত্রটি জানিয়েছে, দণ্ড কার্যকরের জন্য জল্লাদ রাজুর নেতৃত্বে হযরত, মাসুদ, ইকবাল, রনি, মোক্তার, আবুল ও সাত্তার নামে আট জল্লাদ প্রস্তুত রয়েছেন। এদের মধ্যে যেকোনও চারজনকে ডাকা হতে পারে।

গত সোমবার সুপ্রিম কোর্টের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার অরুণাভ চক্রবর্তী বিকেল ৫টা ৩ মিনিটে পূর্ণাঙ্গ রায় বিচারিক আদালত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পৌঁছে দেন। এরপর বাকি কার্যক্রম শেষ করে তা কারাগারসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ঢাকার জেলা প্রশাসকের (ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট) কাছে পাঠানো হয়। এরপর সোমবার রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ফাঁসির (কনডেমড) সেলে থাকা নিজামীকে তা পড়ে শোনায় কারা কর্তৃপক্ষ।

এরপর চিকিৎসকেরা তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। এর আগে নিজামীকে গত রবিবার রাতে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয়।

এর আগে মতিউর রহমান নিজামীর রিভিউ আবেদন খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছে। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হয়ে সেটি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠান। নিয়ম অনুযায়ী, কারা কর্তৃপক্ষ নিজামীকে রায় পড়ে শোনান।

আপিল বিভাগের দেওয়া রিভিউ খারিজের রায়ে বিচারকদের স্বাক্ষরের পর সোমবার (৯ মে) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তা প্রকাশ করেন সুপ্রিম কোর্ট। ২২ পৃষ্ঠার ওই রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করা হয়। আপিল বিভাগের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার অরুনাভ চক্রবর্তী এরপর তা পৌঁছে দেন এ মামলার বিচারিক আদালত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।

সেসময়ে অরুনাভ চক্রবর্তী জানান, রায়ের তিনটি অনুলিপি দেওয়া হয়েছে ট্রাইব্যুনালে। সেগুলো ট্রাইব্যুনাল, কারা কর্তৃপক্ষ ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের জন্য। পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দুইপক্ষের আইনজীবীকেও অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।

পরে সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার শহীদুল আলম ঝিনুক জানান, রিভিউ আবেদন খারিজ হওয়ার আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এতে সই হওয়ার পর ওই আদেশ ও রায়ের কপি কারা কতৃপক্ষ, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। জামায়াত নেতা নিজামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশের রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন গত বৃহস্পতিবার খারিজ করে দেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ রিভিউ আবেদনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মঙ্গলবার শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার তা নিষ্পত্তি করেন। গত ১৫ মার্চ নিজামীর আপিল মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন সর্বোচ্চ আদালত। তার আপিল খারিজ করে ফাঁসি বহাল রেখে দেওয়া এ রায়ের ভিত্তিতে ওই দিনই নিজামীর মৃত্যুপরোয়ানা জারি করেন বিচারিক আদালত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গত ২৯ মার্চ রিভিউ আবেদন করার পর থেকে মৃত্যু পরোয়ানা স্থগিত ছিল। বৃহস্পতিবার রিভিউ খারিজ হওয়ায় আবার সচল হয়েছে এই পরোয়ানা। মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকায় বুদ্ধিজীবী হত্যা ও তার নিজ এলাকা পাবনায় হত্যা, গণহত্যা ও ধর্ষণের দায়ে ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর যুদ্ধাপরাধী নিজামীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্দেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তারই পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও নেতৃত্বে আলবদর বাহিনী বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা বাস্তবায়ন করেছিল বলেও রায়ে বলা হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় নিজামীর বিরুদ্ধে আনা ১৬টি অভিযোগের মধ্যে আটটি ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়। এর মধ্যে পাবনার বাউসগাড়ি ও ডেমরা গ্রামে ৪৫০ জনকে নির্বিচারে হত্যা ও ধর্ষণ, করমজা গ্রামে ১০ জনকে হত্যা ও তিনজনকে ধর্ষণ, ধুলাউড়ি গ্রামে ৫২ জনকে হত্যা এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনার দায়ে (২, ৪, ৬ ও ১৬ নম্বর অভিযোগ) নিজামীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের ওই রায় বাতিল ও বেকসুর খালাস চেয়ে নিজামীর পক্ষ থেকে আপিল করা হলে চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি আপিল আংশিক মঞ্জুর করে সেই ফাঁসির রায় বহাল রাখেন সর্বোচ্চ আদালত। আপিল বিভাগের রায়ে, করমজা গ্রামে ১০ জনকে হত্যা ও তিনজনকে ধর্ষণের দায় (৪ নম্বর অভিযোগ) থেকে নিজামীকে খালাস দেওয়া হয়। বাকি তিন অভিযোগে তার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে করা একটি মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন নিজামীকে গ্রেফতার করা হয়। একই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। ২০১২ সালের ২৮ মে নিজামীর বিরুদ্ধে ১৬টি অভিযোগ গঠন করে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার শুরু করেন ট্রাইব্যুনাল।