‘চাঙ্গা বিএনপিতে’ বাড়ছে ছাত্রনেতাদের সংখ্যা
বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের পর এখন পর্যন্ত দলটির ৪০ নেতাকে মনোনয়ন দিয়েছেন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। নতুন এই কমিটি ঘোষণার পর খুশি সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও। ‘চাঙ্গা’ মনোভাবে দলের নেতাকর্মীরা স্বপ্ন দেখছেন খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখারও।
নতুন কমিটির ঘোষিত ৪০ নেতার মধ্যে ১৭ জনই ছাত্রদলের সাবেক নেতা। তাদের এমন গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রাপ্তিতে আশায় রয়েছেন সংগঠনটির অন্য সাবেক নেতারাও।
ছাত্রদলের সাবেক এসব নেতাদের প্রত্যাশা, অতীতের সক্রিয় কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিয়ে নতুন কমিটিতে নেত্রী (খালেদা জিয়া) তাদেরকে যথাযথ মূল্যায়ন করবেন। তাদের কাছে এখন বিএনপির ছাত্রবিষয়ক ও সহ-ছাত্রবিষয়ক (দুটি) সম্পাদকের পদ ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’। ওই পদে যেতে সর্বোচ্চ লবিং-তদবির চালাচ্ছেন তারা।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ছিলেন। এছাড়া সাত যুগ্ম-মহাসচিবের মধ্যে তিনজনই ছাত্রদলের সাবেক নেতা। খায়রুল কবির খোকন ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও ডাকসুর নির্বাচিত জিএস, হারুন-অর রশিদ সংগঠনটির সাবেক সহ-সভাপতি এবং হাবিব-উন-নবী খান সোহেল সাবেক সভাপতি ছিলেন।
১০ সাংগঠনিক সম্পাদকের মধ্যে ছাত্রদলের সাবেক নেতা রয়েছেন ৫ জন। ফজলুল হক মিলন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি, ডা. সাহাদাত হোসেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ শাখার সাবেক সভাপতি, নজরুল ইসলাম মঞ্জু খুলনা মহানগর ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু নাটোর জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি এবং বিলকিস জাহান শিরিন বরিশাল বিএম কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত এজিএস ছিলেন।
২০ জন সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকের মধ্যে ৮ জন অতীতে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। শহীদুল ইসলাম বাবুল ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি, মাহবুবুর রহমান শামীম সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক, শাহীন শওকত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক নেতা, জয়ন্ত কুমার কুণ্ডু সাবেক সহ-সভাপতি, মাহবুবুল হক নান্নু সাবেক সহ-সভাপতি, মোস্তাক মিয়া সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা, আব্দুল আউয়াল খান ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত জিএস এবং সেলিমুজ্জামান সেলিম সাবেক যুগ্ম-সম্পাদক ছিলেন।
সম্প্রতি গুলশান কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেন, ‘ছাত্রদল নেতাদের এখন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নেয়ার সময় এসেছে।’ সাংগঠনিক নেত্রীর ওই কথা ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের কাছে দারুণ আশার সঞ্চার করেছে।
জানা গেছে, ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম-সম্পাদক কামরুজ্জামান রতন যুবদলের শীর্ষ নেতৃত্ব প্রত্যাশী। বিএনপির সম্পাদকীয় পদেও অধিষ্ঠিত হতে পারেন তিনি। বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী যুগ্ম-মহাসচিব পদে আলোচনায় ছিলেন। এখন তিনি যুবদলের সভাপতি পদে জোরালো প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব পদের সংখ্যা আরো দুই-তিনটি বাড়ানো হতে পারে। সেক্ষেত্রে এ্যানীর ওই পদ প্রাপ্তির সম্ভাবনাও থাকছে।
বিএনপির বিদায়ী কমিটির নির্বাহী সদস্য ও ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আজিজুল বারী হেলাল দলটির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক পদে জোরালো প্রতিদ্বন্দ্বী। দলটির সহ-ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু যুবদলের সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন (সাইফুল আলম নীবর-টুকু)। এর বাইরে এ্যানী-নীরবও আসতে পারেন যুবদলের শীর্ষ নেতৃত্বে। সেক্ষেত্রে টুকুর ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ওই পদে টুকুর ব্যাপারে খালেদা জিয়া তেমন ইতিবাচক নন বলে জানা গেছে।
বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলিম স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনা রয়েছেন। পাশাপাশি তিনি বিএনপির সহ-ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক পদেও প্রতিদ্বন্দ্বী। এছাড়া ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আব্দুল কাদের ভুইয়া জুয়েল স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক পদে জোরালো প্রতিদ্বন্দ্বী। একইসঙ্গে বিএনপির সহ-ছাত্রবিষয়ক সম্পাদকের পদেও আলোচনায় রয়েছেন। যেতে পারেন দলের অন্য সহ-সম্পাদকীয় পদেও।
ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশিদ হাবিব যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক পদের আলোচনায় রয়েছেন। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক কিংবা বিএনপির সহ-সম্পাদকীয় পদেও যেতে পারেন। এছাড়া ঢাকা মহানগর দক্ষিণ (দুই ভাগ হলে) বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদেও প্রতিদ্বন্দ্বী তিনি।
ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি বজলুল করিম চৌধুরী আবেদ বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছে। তবে সিনিয়র কাউকে ওই পদে দেয়া হলে সেক্ষেত্রে তিনি সহ-ছাত্রবিষয়ক সম্পাদকের পদ পেতে পারেন। সংগঠনটির সাবেক সহ-সভাপতি নুরুল ইসলাম নয়ন বিএনপির সহ-সম্পাদকীয় পদে যেতে পারেন। ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি সাইফুল ইসলাম ফিরোজ স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন। এছাড়া বিএনপির সহ-ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক পদেও প্রতিদ্বন্দ্বী তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি হাসান মামুন বিএনপির সহ-ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক কিংবা অন্য সহ-সম্পাদকীয় পদ পেতে পারেন। তাকে যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম-সম্পাদক অথবা সাংগঠনিক সম্পাদকও করা হতে পারে।
ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক আমিরুজ্জামান খান শিমুল বিএনপির সহ-ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন। যেতে পারেন অন্য সহ-সম্পাদকীয় পদেও। সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন বিএনপির সহ-ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক অথবা অন্য সহ-সম্পাদকীয় পদ পেতে পারেন। হতে পারেন নির্বাহী সদস্যও। তিন মাস নিখোঁজ থাকার পর গত বছরের ১৫ জুন ফরিদপুর থেকে খোকনকে আটক করে র্যাব। এরপর গত ৩১ জানুয়ারি জামিনে মুক্তি পান তিনি।
ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি হায়দার আলী লেলিন দলের সহ-সম্পাদক কিংবা নির্বাহী সদস্য হতে পারেন। তবে টুকু যুবদলের সাধারণ সম্পাদক হলে সেক্ষেত্রে তিনি সংগঠনটির সিনিয়র যুগ্ম-সম্পাদক হতে পারেন। ঢাবির সাবেক আহ্বায়ক আব্দুল মতিন বিএনপির সহ-ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক কিংবা অন্য কোনো সহ-সম্পাদক অথবা নির্বাহী সদস্য হতে পারেন। সাবেক কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম-সম্পাদক ওবায়দুল হক নাসির বিএনপির সহ-ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। এছাড়া হতে পারেন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদকও।
ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক (স্বেচ্ছাসেবক দলের বর্তমান সেক্রেটারি) শফিউল বারী বাবু স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি পদে জোরালো প্রতিদ্বন্দ্বী। এছাড়া স্বেচ্ছাসেবক দলের সেক্রেটারি ও ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি মীর সরফত আলী সপু সংগঠনটির সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন। স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম-সম্পাদক (একইসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণের আহ্বায়ক) ও কবি নজরুল কলেজ ছাত্রসংসদের সাবেক ভিপি আলী রেজাউর রহমান রিপন সংগঠনটির সেক্রেটারি পদ পেতে পারেন।
গত ১ জানুয়ারি ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে খালেদা জিয়া ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের অভয় দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমাদের কারোর চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বয়সের কারণে তোমরা যারা ছাত্রদল করতে পারবে না, তাদের আমি যুবদল-স্বেচ্ছাসেবক দল এমনকি বিএনপিতেও নিয়ে যেতে পারি।’
ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি দুলাল হোসেন, ওমর ফারুক সাফিন, আবু বকর সিদ্দিক, শেখ মো. শামীম, সাইফুল ইসলাম, আনোয়ারুল হক রয়েল, আবু সাঈদ, শেখ আব্দুল হালিম খোকন, আহসান উদ্দিন খান শিপন, বিল্লাল হোসেন তারেক, তরুণ দে, শহীদুল্লাহ ইমরান, রাজু তালুকদার, মাহবুবুর রশিদ মাহবুব, গোলাম মওলা শাহীন, এবিএম পারভেজ রেজা এবং ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সভাপতি কামাল আনোয়ার আহমেদ বিএনপির নির্বাহী সদস্য হতে পারেন। তবে ব্যাপারটি নির্ভর করছে নির্বাহী কমিটির কলেবর বড় হওয়ার ওপর। অন্যথায় তারা যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম সম্পাদক পদে অধিষ্ঠিত হতে পারেন।
ছাত্রদলের বর্তমান সভাপতি রাজীব আহসানও সহ-ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক পদের প্রত্যাশী। তবে বিএনপির গঠনতন্ত্রে ‘এক নেতার এক পদ’র বিধান সংযোজিত হওয়ায় ওই পদে রাজীবের সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে জানা যায়। ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি এটিএম আব্দুল বারী বিএনপির সহ-সম্পাদকীয় পদে যেতে পারেন। হতে পারেন যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি কিংবা সাংগঠনিক সম্পাদকও।
পারিপার্শ্বিক নানা কারণে দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা ঢাবি ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মনির হোসেন রাজনীতিতে ফের সক্রিয় হয়েছেন। অতীতের সক্রিয়তা বিবেচনায় দল তাকে একটি জায়গায় অধিষ্ঠিত করতে পারে। এছাড়া যুবদলের বর্তমান সহ-সভাপতি ও ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি ফরহাদ হোসেন আজাদ বিএনপির সহ-সম্পাদকীয় পদ পেতে পারেন। জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ‘ছাত্রদলের সাবেক নেতারা ধীরে ধীরে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হবে, এটিই স্বাভাবিক। ছাত্রদলের সাবেক নেতা হিসেবে সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব পদে রুহুল কবির রিজভীর ইতোমধ্যে পদায়ন হয়ে গেছে। এছাড়া যুগ্ম-মহাসচিব, সাংগঠনিক ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক পদেও সাবেক ছাত্রনেতারা এসেছে। মনে হয়, এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।’


