English Version
আপডেট : ১৭ এপ্রিল, ২০১৬ ১২:২১

বাবাকে দেখার অপেক্ষা ৪ বছরেও শেষ হয়নি সাইয়ারা নাওয়ালের

অনলাইন ডেস্ক
বাবাকে দেখার অপেক্ষা ৪ বছরেও শেষ হয়নি সাইয়ারা নাওয়ালের
নিখোঁজ ইলিয়াস আলীর ছবি হাতে সাইয়ারা নাওয়াল

আজ (১৭ এপ্রিল) বিএনপির কেন্দ্রীয় সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক, সিলেট-২ আসনের সাবেক এমপি এম. ইলিয়াস আলী নিখোঁজের ৪ বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০১২ সালের ১৭ই এপ্রিল রাতে ঢাকার বনানী থেকে ব্যক্তিগত গাড়িচালক আনসার আলীসহ রহস্য জনকভাবে ‘নিখোঁজ’ হন তিনি। নিখোঁজের পর দেশব্যাপী গড়ে ওঠে কঠোর আন্দোলন। ইলিয়াসের ভালোবাসায় প্রাণ দেন বিশ্বনাথের তিন বিএনপি’র কর্মী। ফিরে পাওয়ার আন্দোলন করতে গিয়ে হামলা-মামলা শিকার হন হাজার হাজার বিএনপি-জামায়াত কর্মী ও সাধারণ মানুষ। বাণিজ্যিক এ সব মামলায় কারাবরণ করেন বিএনপি নেতাকর্মীসহ শ’ শ’ সাধারণ মানুষ। তবুও আন্দোলন থেকে পিছু হটেনি ইলিয়াস প্রেমীরা। ২৩শে এপ্রিল রণক্ষেত্রে পরিণত হয় বিশ্বনাথ উপজেলা সদর। সারা দেশে আতঙ্কের জনপদ হিসেবে পরিচিতি পায় এই উপজেলা।

সেদিন ইলিয়াস আলীর সন্ধান দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে ত্রিমুখী সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান জাকির, মনোয়ার ও সেলিম নামের তিন ইলিয়াস সমর্থক। কিন্তু একে একে নিখোঁজের চার বছর পূর্ণ হলেও আজ পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান দিতে পারেনি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরপরও নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম ইলিয়াসের জন্য অন্তঃহীন অপেক্ষা চলছে বিশ্বনাথবাসীর।

বিএনপি নেতা সাবেক অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমান মারা যাওয়ার পর এম. ইলিয়াস আলী হয়ে ওঠেন সিলেট বিএনপি’র একমাত্র কাণ্ডারী। শুধু সিলেট নয়, গোটা বিভাগের একজন অবিভাবক হিসেবে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। এ অবস্থায় পরিবার থেকে শুরু করে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে অসন্তোষ বিরাজ করছে। আজও জানা যায়নি তিনি কোথায়? তদুপরি তাঁর নির্বাচনী এলাকা বিশ্বনাথ, বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগর বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ এখনও বিশ্বাস করেন ইলিয়াস আলী জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় আবার জনতার মাঝে ফিরে আসবেন। ইলিয়াসকে ফিরে পেতে আন্দোলনের নানা কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

চলতি মাসে নবগঠিত সিলেট জেলা বিএনপি’র পক্ষ থেকে মাসব্যাপী আন্দোলন কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ফিরে পাওয়ার দাবি জানিয়ে গত ১০ই এপ্রিল জেলা ও উপজেলা বিএনপি’র নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারক লিপি প্রদান করেন।

এদিকে আগামী ৭ই মে অনুষ্ঠিতব্য ইউপি নির্বাচনকে ঘিরে পুরো উপজেলা জুড়ে বইছে নির্বাচনী হওয়া। উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা মাঠে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা ভোট চাইতে ইলিয়াস নিখোঁজের ইস্যুকে সামনে রেখে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এছাড়াও ইলিয়াসপত্নী তাহসিনা রুশদীর লুনাও দলীয় প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করতে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। বিগত উপজেলা পরিষদ ও ইউপি নির্বাচনে সবক’টি ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান-ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিএনপি প্রার্থীরা নির্বাচিত হন। এতে বিএনপি’র ঘাটি হিসেবে পরিচিতি পায় বিশ্বনাথ উপজেলা। ইলিয়াস আলীর অনুপস্থিতিতেও এ বিজয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চান বিএনপি কর্মীরা। কিন্তু ইলিয়াস নিখোঁজের পর স্থানীয় বিএনপিতে দেখা দেয় দ্বিধা বিভক্তি। এই দ্বন্দ্বের জের ধরে একাধিকবার হামলা, সংঘর্ষ ও মামলার ঘটনা ঘটেছে। ফলে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠন। এ সুযোগে রাজপথের দখল নেয় ক্ষমতাসীনদল আওয়ামী লীগ। এবারের ইউপি নির্বাচনেও বিএনপি’র দলীয় প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এতে ইলিয়াস আলীর নিজ ইউনিয়ন অলঙ্কারী ও রামপাশা ইউনিয়নে বিএনপির বিদ্রোহী দুই প্রার্থী স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন।

বিএনপি নেতাকর্মীরা মনে করেন ইলিয়াস নিখোঁজের পর যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে বিএনপিতে প্রকাশ্যে কোন্দল সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপি’র রাজপথের পরীক্ষিত কর্মীদের মনোনয়ন না দিয়ে দুই ইউনিয়নে জন-বিচ্ছিন্ন দুই প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়ায় স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। এসব নেতাকর্মীও সমর্থকরা ত্যাগী নেতা হিসেবে বিদ্রোহীদের পক্ষেই নিরলসভাবে মাঠে কাজ করছেন।

অপরদিকে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই স্বামীকে খুঁজে পাওয়ার আশায় বিস্তর থানা-পুলিশ করেছেন তার স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পর্যন্ত গেছেন।

‘ওইসময় প্রধানমন্ত্রী আমাদেরকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে অবশ্যই উনি আন্তরিকতার সাথে বিষয়টা দেখবেন এবং ইলিয়াস আলীকে উদ্ধারের চেষ্টা করবেন’, বলেছেন মিসেস রুশদীর। কিন্তু পরবর্তীতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে এ ব্যাপারে কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি বলেন, চেষ্টা তো অবশ্যই করেনি। এটা একটা লোক দেখানো। কারণ তখন আন্দোলন শুরু হয়েছিল দেশে। সম্ভবত আন্দোলনটাকে বন্ধ করার জন্যই একটা লোক দেখানো প্রচেষ্টা। এই নিখোঁজের ব্যাপারে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল এবং হাইকোর্টে একটি রিটও করা হয়েছিল।

সেই রিট অনুযায়ী হাইকোর্ট পুলিশকে প্রতিমাসে একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে বলেছিল। কিন্তু মিসেস রুশদীর বলেছেন, কোনো অগ্রগতি পরবর্তীতে তারা জানতে পারেননি। দেশবাসী এমন কিছু প্রত্যক্ষ করেনি যাতে দেখা গেছে যে ইলিয়াস আলী গুমের ব্যাপারে কাউকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে বা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ওনারা শুধু বলেছেন ওনারা চেষ্টা করেছেন।

তিনি আরো বলেন, ওনারা চেষ্টা করলে ওনারা খুঁজে বের করতে পারবে। কিন্তু এটাতে তাদের যদি আগ্রহ না থাকে তাহলেতো আর খুঁজে বের করবে না।

স্বামী বেঁচে আছেন বলে বিশ্বাস করেন তাহসিনা রুশদীর এবং তাকে ফিরে পাবেন বলে আজও আশা আছে তার। তাহসিনা রুশদীর বলেন, ফিরে পাব এই আশাটা যেমনি থাকবে তেমনি দাবীটাও থাকবে যে, আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দেয়া হোক। সেই দাবীটা শেষ পর্যন্ত থাকবে।সূত্র: ম.জমিন/বিবিসি।

প্রতিবার 'আব্বুকে খুব মিস করি। আব্বু ছাড়া আমার কোনো আনন্দ নেই। কোনোকিছুই ভালো লাগে না। আব্বুকে ফেরত দিন।' কথাগুলো নিখোঁজ বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীর একমাত্র কন্যা সাইয়ারা নাওয়ালের।