আমেরিকান দূতকে ডেকে অসন্তোষ প্রকাশ
মানবাধিকার লঙ্ঘন করার অভিযোগে এলিট ফোর্স র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ও পুলিশের বর্তমান মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এবং বর্তমান মহাপরিচালকসহ সাত শীর্ষ কর্মকর্তার যুক্তরাষ্ট্রে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ঘটনায় দেশটির রাষ্ট্রদূতকে তলব করে ব্যাখ্যা চেয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ ঘটনায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় শুরু হয়েছে। বাইডেন সরকারের দাবি, ২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত এলিট ফোর্স র্যাব প্রায় ৬০০ জনকে গুম করেছে। তবে র্যাব গতকাল শনিবার বলেছে, তারা কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন করেনি। বরং মানবাধিকার রক্ষা করতে গিয়েই সাবেক গোয়েন্দা প্রধানসহ ২৮ জন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল মিলারকে গতকাল ডেকে নেওয়া হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এমএ মোমেন বলেছেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার প্রধানকে যুক্ত করা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন একটা ঢং। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও এই নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিটি অভিযোগ ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। কোনো সংস্থা মানবাধিকার লঙ্ঘন করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র বস্তুনিষ্ঠভাবে নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। তারা অতিরঞ্জিত সংবাদের ওপর ভিত্তি করে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এ বিষয়ে তাদের নতুন কোনো বক্তব্য নেই বলে জানানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্রেই মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হয় বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। তাদের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ‘একপেশে এবং অকার্যকর’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় আইজিপিসহ পুুলিশ ও র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গতকাল বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠকে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। অভিযোগ ঢালাও মতপ্রকাশ করে তারা বিস্ময় প্রকাশ করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিসের ভিত্তিতে আমেরিকার মতো একটি দেশ এত বড় সিদ্ধান্ত নিল? ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত গুম বা ক্রসফায়ারের ঘটনার অজুহাত তুলে তারা কর্মকর্তাদের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ২০০৪ সালে র্যাব প্রতিষ্ঠার পরপরই শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হান্নান ক্রসফায়ারে মারা যান। তাছাড়া “বন্দুকযুদ্ধে” আরও অনেকে মারা গেছেন। র্যাব ও পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্যও মারা গেছেন এ সময়ে। যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু ওই সময়কারের বিষয়গুলো সামনে আনেনি। এতেই বোঝা যায়, নিষেধাজ্ঞার পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে। তাছাড়া আমরা কখনো মানবাধিকার লঙ্ঘন করিনি। অপরাধীরা হামলা করলে পুলিশ বা র্যাব পাল্টা আঘাত করবে এটাই স্বাভাবিক।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গত শুক্রবার আইজিপির মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল। ওই সময়ই আমরা বিষয়টি জানতে পারি। তখন আইজিপিকে বিষয়টি অবহিত করা হয়।’
যুক্তরাষ্ট্র বলছে, র্যাব গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী, সহযোগী বা পরোক্ষভাবে জড়িত। আর র্যাবের কর্মকর্তাদের বিষয়ে সেখানে বলা হয়েছে, তারা র্যাবের নেতৃত্বে বা কর্মকর্তা হিসেবে আছেন বা ছিলেন। তাদের দায়িত্ব পালনের সময় র্যাব বা এর সদস্যরা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। এই নিষেধাজ্ঞার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের কোনো সম্পদ থেকে থাকলে তা অবরুদ্ধ করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা তাদের সঙ্গে লেনদেন করতে পারবেন না। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ সরকারের মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে র্যাবের মাধ্যমে ‘গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপক অভিযোগ’ রয়েছে, যা আইনের শাসন, মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে খাটো করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলেছে। বেসরকারি সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে, র্যাব ও বাংলাদেশের অন্য আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ২০০৯ থেকে ছয় শতাধিক গুম এবং ২০১৮ সাল থেকে প্রায় ৬০০ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের জন্য দায়ী।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য বিভিন্ন দেশের ১৫ ব্যক্তি এবং ১০ প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও চীন, মিয়ানমার ও উত্তর কোরিয়ার কর্মকর্তা এবং প্রতিষ্ঠান রয়েছে। চীনের চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে জিনজিয়াংয়ে উইঘুরসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের কারণে। বিজ্ঞপ্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের একজন উপমন্ত্রী ওয়ালি আডেয়েমোর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, এ পদক্ষেপ একটি বার্তা দিচ্ছে যে, যারা নিপীড়ন চালাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করবে, তাদের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র কথা বলবে।
যাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে : যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের নিষেধাজ্ঞায় থাকা কর্মকর্তারা হচ্ছেন সাবেক র্যাব মহাপরিচালক ও বর্তমান আইজিপি বেনজীর আহমেদ, র্যাব মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) খান মোহাম্মদ আজাদ, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) তোফায়েল মোস্তাফা সরোয়ার, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) মো. জাহাঙ্গীর আলম ও সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) মো. আনোয়ার লতিফ খান।
কারা কখন দায়িত্বে ছিলেন : ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত র্যাবের ডিজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বেনজীর আহমেদ। আর চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে র্যাবের মহাপরিচালকের দায়িত্বে আছেন। খান মোহাম্মদ আজাদ গত ১৬ মার্চ থেকে র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তোফায়েল মোস্তাফা সরোয়ার ২০১৯ সালের ২৭ জুন থেকে গত ১৬ মার্চ পর্যন্ত র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মো. জাহাঙ্গীর আলম ২০১৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৯ সালের ২৭ জুন পর্যন্ত র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) ছিলেন। আর মো. আনোয়ার লতিফ খান ২০১৬ সালের ২৮ এপ্রিল থেকে ২০১৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) পদে ছিলেন।
মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে তলব : র্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলারকে ডেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। গতকাল রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দুঃখজনক। ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি নিজেও সারপ্রাইজড। যেকোনো অভিযোগ তথ্যভিত্তিক হওয়া উচিত। তা ঢালাওভাবে বলা ঠিক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ, যেখানে পরিপক্ব গণতন্ত্র রয়েছে, তাদের কাছ থেকে এমন ঢালাও অভিযোগ কাম্য নয়। কারণ তাদের দেশে প্রতি বছর ছয় লাখ লোক নিখোঁজ হন।’ তিনি বলেন, ‘আমরা খুব শান্তিতে ছিলাম। মালয়েশিয়া থেকে শ্রমবাজার নিয়ে সুখবর পেলাম। কিন্তু রাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্রদূত আমাকে ফোন করে জানালেন, বাইডেন প্রশাসন র্যাবের কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তারা আমাদের দেশের একটি প্রতিষ্ঠানকে লিস্টেড করেছে। এটা খুবই দুঃখজনক। এগুলো লোক দেখানো, ফ্যাক্ট বেইজড নয়।’ ড. মোমেন বলেন, ‘আমেরিকা একটা পরিপক্ব দেশ। ওখানে অনেক পন্ডিত লোক থাকে। তারা অনেক প্রগেসিভ আইডিয়া দেয়। কিন্তু সেটা মোর সলিড ফ্যাক্ট বেইজড হতে হবে। তারা নিজেদের দেশে এবং বাইরে অনেকগুলো অ্যাকশন নিয়েছে, যেগুলোতে পরে দেখা যায় তারা লাভবান হয়নি। তাই বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি খুবই দুঃখজনক।’
যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত হতাশার : পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে র্যাব কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সিদ্ধান্তকে ‘হতাশাজনক’ বলে মন্তব্য করা হয়েছে। রাষ্ট্রদূত মিলারকে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন কর্তৃক তলবের বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়ে গতকাল এই সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের পূর্বালোচনা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একতরফা সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। তিনি বলেছেন, ‘নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য যেসব বিষয়কে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে, সেগুলো নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপে ফ্রেমওয়ার্কসহ বিভিন্নভাবে দুপক্ষের মধ্যে আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। তারপরও কোনো ধরনের আভাস দেওয়া ছাড়াই এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত।’ পররাষ্ট্র সচিব বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি সংস্থাকে খাটো করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেটি সন্ত্রাস, মাদক চোরাচালান এবং অন্যান্য আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ দমনে ‘সামনের সারিতে’ রয়েছে। র্যাবের বিরুদ্ধে এমন কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো বিচারপ্রক্রিয়া ও জবাবদিহিতাসহ বিভিন্ন বিষয় এর আগে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাখ্যা শুধু যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে নয়, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিভিন্ন ফোরামেও বহুবার দেওয়া হয়েছে। যেসব ঘটনা উল্লেখ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেগুলো ‘তথ্যভিত্তিক’ হওয়ার পরিবর্তে ‘যাচাইহীন ও প্রমাণহীন’ মনে হচ্ছে।” যেসব দেশের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তাদের কাতারে বাংলাদেশের কর্মকর্তাদেরও রাখায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, ‘কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ এলে তার প্রতিকারের জন্য নির্দিষ্ট আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া মেনে চলে বাংলাদেশের সব পোশাকি বাহিনী, র্যাবও এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অপব্যবহারের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য অনেক দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে সংঘটিত হওয়ার প্রতিবেদন পাওয়া যায়। তাই বলে এর জন্য কোনো সংস্থার উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিষেধাজ্ঞার জন্য বেছে নেওয়া যুক্তিযুক্ত হতে পারে না।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যা বললেন : র্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ দুঃখজনক বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানও। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি ঘটনা ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে তদন্ত করা হয়ে থাকে। কোনো সংস্থার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’ গতকাল সকালে কারওয়ানবাজারে ঢাকা ওয়াসার বুড়িগঙ্গা হলে ‘আদর্শ গ্রাহক সম্মাননা স্মারক-২০২১’ বিতরণ অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বস্তুনিষ্ঠভাবে নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। তারা অতিরঞ্জিত সংবাদের ওপর ভিত্তি করে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আমাদের কোনো সংস্থা মানবাধিকার লঙ্ঘন করে না। করলে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা চ্যালেঞ্জিং। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ ইচ্ছে করে ক্রসফায়ার কিংবা গুলি করতে পারে না। সন্ত্রাসীরা যখন আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে, তখন আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী জীবন রক্ষার্থে হয়তো অনেক সময় গুলি করে থাকে। তখন সেটা তার জন্য বৈধ।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে বন্দুকযুদ্ধের যতগুলো ঘটনা ঘটেছে সবগুলোরই একটি জুডিশিয়াল তদন্ত হয়। জানা-চেষ্টা করা হয়, যে ঘটনা ঘটল তার পেছনে যথাযথ কারণ ছিল কি না, নাকি গাফিলতি ছিল। কোথাও গাফিলতি পেলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এসব ঘটনার পেছনে কোনো কারণ ছিল বলেই আমাদের কাছে প্রতীয়মান। এসব ঘটনা শুধু আমাদের দেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘটছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন কুমিল্লায় প্রকাশ্যে ৮-৯ সন্ত্রাসী যেভাবে বন্দুক উঁচু করে গুলি করছিল। এদের কাছে যদি নিরাপত্তা বাহিনী আসে; এরা আবার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়।’
র্যাব কখনো মানবাধিকার লঙ্ঘন করে না : র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) কর্নেল খান মোহাম্মদ কেএম আজাদ বলেছেন, র্যাব কখনো মানবাধিকার লঙ্ঘন করে না। সবসময় মানবাধিকার রক্ষা করে আসছে। মানুষের অধিকার রক্ষা করাই র্যাবের প্রধান দায়িত্ব। আমরাই (র্যাব) বড় মানবাধিকারকর্মী। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ‘গুরুতর’ অভিযোগ তুলে র্যাব এবং এই বাহিনীর সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার প্রবেশে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রতিক্রিয়া তিনি এমন মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে খুন, ধর্ষণ করে মাদক ব্যবসা চালায়, দেশ এবং জনগণের স্বার্থেই আমরা তাদের আইনের আওতায় এনে থাকি।
র্যাবের মানবিকতা বিশ্বের কম বাহিনীই দেখিয়েছে : র্যাব প্রতিষ্ঠার পর থেকে জঙ্গি ও জলদস্যু মিলে ৪২১ অপরাধী আত্মসমর্পণ করেছেন। তারা এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন। র্যাবের এমন মানবিক আত্মসমর্পণের সুযোগ বিশ্বের কোনো বাহিনী দেয়নি। র্যাব সবসময় মানবিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। অপরাধীদের আত্মসমর্পণের সুযোগ দিয়ে মানবিকতার নজির স্থাপন করেছে। র্যাব মানবাধিকার লুণ্ঠন করেনি বরং মানবাধিকার রক্ষা করে চলছে। ৪২১ জঙ্গি-দস্যুর এই আত্মসমর্পণের সুযোগ র্যাবের মানবিকতার একটি নজির। গতকাল দুপুরে কারওয়ানবাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে সুন্দরবনে ৩২৮ ও চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ৭৭ জলদস্যু এবং ১৬ জঙ্গি রয়েছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি আমরা গণমাধ্যমের মাধ্যমে অবগত হয়েছি। এ বিষয়ে অফিশিয়ালি এখনো কোনো কিছু জানি না। অফিশিয়াল কোনো চিঠি না পাওয়ার আগপর্যন্ত এ বিষয়ে তেমন কিছু বলতে পারছি না। চিঠি পাওয়ার পর আমরা এ বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেব। তবে আমরা বলব, র্যাব মানবাধিকার লুণ্ঠন করেনি, মানবাধিকার রক্ষা করে চলছে।’ র্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের ৯ হাজারের যে ফোর্স (সদস্য), এই ফোর্সের লে. কর্নেল আজাদসহ ২৮ জন সদস্য জীবন দিয়েছেন। আর মানবাধিকার রক্ষায় এবং আইনশৃঙ্খলা সমুন্নত রাখতে আমাদের এক হাজারের বেশি সদস্যের অঙ্গহানি হয়েছে। এছাড়া আমাদের দুই হাজারের বেশি সদস্য আহত হয়েছেন। বিশ্বের এমন কোনো ফোর্স নেই যাদের ৯ হাজার সদস্যের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার রক্ষায় এমন আত্মত্যাগ রয়েছে।’
কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘বিভিন্ন বাহিনীর চৌকস অফিসার ও সদস্যদের নির্বাচন করে একটি বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে র্যাবে আনা হয়। নিজস্ব আইন ও নিয়ম কঠোরভাবে পালন করা হয়। এখানে নিয়মের বাইরে কোনো কিছু করার সুযোগ নেই। দেশে র্যাবই প্রথম বাহিনী যেখানে নিজস্ব সদস্যের জন্য ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা করেছে। এখন সরকারি চাকরিতে ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে র্যাব কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বন্ধসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সফল ও সার্থকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। করোনা মহামারীতে সন্তান বাবাকে, বাবা সন্তানকে ফেলে গিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে র্যাব হেলিকপ্টার ব্যবহার করে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে, হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করেছে।’


