পুরোনো রূপে ফিরেছে দেশ
করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব রোধে চার মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা কঠোর বিধিনিষেধের লকডাউন শেষ হয়েছে।
অবশেষে বিধিনিষেধ শিথিল করায় বুধবার (১১ আগস্ট) থেকে প্রায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে দেশ।
এদিন বাস, ট্রেন, লঞ্চ চলাচলের পাশাপাশি খুলেছে দোকানপাট, শপিংমল, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি-বেসরকারি অফিস। তবে বাস, লঞ্চ, ট্রেন ও মার্কেটসহ কেউ মানছেন না স্বাস্থ্যবিধি। তাই বিধিনিষেধ উঠে যাওয়ায় করোনা আরো লাগামহীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
দীর্ঘদিন ধরে কয়েক ধাপের বিধিনিষেধ চললেও তা করোনাভাইরাসকে কতটুকু দুর্বল করতে পেরেছে, তা নিয়েও বিতর্ক আছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে।
এদিকে করোনাভাইরাস সংক্রমণে বিধিনিষেধের মধ্যেও প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ের বিভিন্ন বিভাগ আংশিক সচল ছিল। কিন্তু ঈদুল আজহার ছুটির পর প্রায় পুরো সচিবালয়ের কর্মকাণ্ডই বন্ধ হয়ে যায়। টানা ১৯ দিন ঈদের ছুটি শেষে গতকাল প্রশাসনের সচিবালয়ে কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছে। সকাল থেকেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে কর্মচারীদের উপস্থিতি ছিল শতভাগ।
সচিবালয়ে এদিন বেলা ১১টায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলাবদ্ধতা নিরসন ও নিষ্কাশন উন্নয়ন শীর্ষক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম ছাড়াও দুই মন্ত্রণালয়ের সচিব অংশ নেন।
বুধবার (১১ আগস্ট) সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তাঘাট ঘুরে দেখা গেছে, লকডাউন শিথিলের প্রথম দিনের সকালেই রাজধানী চিরচেনা রূপে ফিরে এসেছে। বিভিন্ন রাস্তাঘাটে রিকশা, সাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, ভ্যানগাড়ি, কাভার্ডভ্যান, ছোট-বড় বাস, জিপগাড়ি ও মাইক্রোবাসসহ অসংখ্য যানবাহন চলাচল করছে।
লকডাউনের কারণে এতদিন অধিকাংশ এলাকার রাস্তাঘাটে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের অনেকটা নির্বিকার সময় কাটলেও গতকাল ভোর থেকেই বিভিন্ন পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের তৎপরতা দেখা যায়। সকালের দিকে সরকারি-বেসরকারি অফিসগামীদের ভিড় থাকায় বেশ কয়েকটি রাস্তায় যানজটের সৃষ্টি হয়।
এ সময় ট্রাফিক পুলিশকে ব্যতিব্যস্ত হয়ে যানজট সামাল দিতে দেখা যায়।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য ও রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জীবন ও জীবিকার তাগিদে লকডাউন শিথিল করা হলেও করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু কমাতে শতভাগ মাস্ক পরিধানসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই।
কিন্তু সরেজমিন দেখা গেছে, বাইরে বের হওয়া অধিকাংশ মানুষের মুখে মাস্ক থাকলেও সঠিকভাবে মাস্ক পরিধান করছেন না। কেউ কেউ আবার রাস্তার মোড়ে আড্ডা দিচ্ছেন, সিগারেট টানছেন। বিশেষ করে দরিদ্র শ্রেণির মানুষ মুখে মাস্ক পরিধান না করেই বসে আছেন।
মার্কেট দোকানপাট পুরোপুরি খুললেও সেখানে উপেক্ষিত ছিল স্বাস্থ্যবিধি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই ছিলেন মাস্ক ছাড়া। ছিলো না জীবাণুনাশকের ব্যবস্থাও। স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে কিনা সেটি নজরদারির ব্যবস্থাও দেখা যায়নি।
সরকারি নির্দেশনা মেনে দেশের অন্যান্য বিপণিবিতানের মতোই সকাল ১০ টায়, রাজধানীর গাউসিয়া মার্কেট খুলেছে। তবে মার্কেট খুললেও, খুব বেশি ক্রেতার আনাগোনা ছিল না।
এদিকে স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই ছিল না ক্রেতা বিক্রেতার উভয়েরই মাঝে। বেশিরভাগ দোকানদারই মাস্ক ছাড়াই বেচাকেনা করছিলেন। একই অবস্থা ফুটপাতের দোকানগুলোতেও। বেশিরভাগ দোকানের মালিক-কর্মচারীই এখনো করোনার ভ্যাকসিন নেননি। তাই থেকে যাচ্ছে সংক্রমণ ঝুঁকি।
বুধবার (১১ আগস্ট) সকাল থেকে শতভাগ যাত্রী নিয়ে বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে বেশ কিছু ট্রেন। এসব ট্রেনের মধ্যে রয়েছে-বলাকা এক্সপ্রেসে, তুরাগ এক্সপ্রেসে, দেওয়ানগঞ্জ কমিউটার, পারাবাত এক্সপ্রেসে, সেনার বাংলা এক্সপ্রেসে, তিস্তা এক্সপ্রেসে এবং মহানগর প্রভাতি।
তবে এসব ট্রেনের বেশির ভাগ যাত্রীদের মধ্যে ছিল স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত। টিকিট কাউন্টারে ছিল না সামাজিক দূরত্ব।
কিন্তু কমলাপুর রেল স্টেশনের স্টেশন মাস্টার রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে সিটের সমপরিমাণ যাত্রী নিয়ে সীমিত পরিসরে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করছে। বিক্রি হচ্ছে না স্ট্যান্ডিং টিকিট।
কমলাপুর রেল স্টেশনের স্টেশন মাস্টার শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি মানার দাবি করলেও বুধবার সকালে প্রথমে টিকিট কাউন্টারে সামাজিক দূরত্ব একেবারেই মানতে দেখা যায়নি। দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তারক্ষী ও ছিল না নিজ জায়গায়। তবে মাস্ক পরা, তাপমাত্রা মাপা এবং রেল জীবাণুমুক্ত করার নিয়ম মানা হয়েছে অনেকটাই।
বুধবার (১১ আগস্ট) ঢাকা থেকে ২৫ জোড়া আন্তঃনগর এবং ১২ জোড়া মেইল-কমিউটার ট্রেন চলাচল করছে। আর সারা দেশ থেকে ৩৮ জোড়া আন্তঃনগর এবং ২০ জোড়া মেইল-কমিউটার ট্রেন চলাচল করছে।
এদিকে মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকেই রাজধানী ছেড়ে যায় দূরপাল্লার বাস। তবে যাত্রীসংখ্যা ছিল কম। গতকাল সকাল থেকেই রাজধানীসহ সারাদেশের সড়কে দেখা মেলে পুরোনো চিত্রের। শতভাগ আসনে যাত্রী নিয়ে অর্ধেক গণপরিবহন চলাচল করেছে। এক সাথে সবধরণের গণপরিবহন চালু হওয়ায় বিভিন্ন সড়কে দেখা গেছে চিরচেনা যানজট। প্রায় একমাস পর চালকের আসনে বসতে পেরে খুশি চালকরা। তবে, স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে যাত্রী ও চালকের উদাসীনতা দেখা গেছে।
সড়কে অর্ধেক গাড়ি চলাচল নির্ধারণ করা কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ। তিনি বলেন, প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে-মোট পরিবহন সংখ্যার অর্ধেক চলাচল করবে। এক্ষেত্রে এক মালিকের কয়টি গাড়ি আছে বা কতটি গাড়ি চালাচ্ছে এই বিষয়টি নির্ণয় করা কঠিন।
এছাড়া শ্রমিকরা বেকার বসে থাকবে। মালিকরাও ব্যবসায়িকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা সরকারের নির্দেশনা মেনেই বর্ধিত ভাড়া না নিয়ে আগের ভাড়ায় গাড়ি চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
রাজধানীর পলাশীতে কর্তব্যরত একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট জানান, লকডাউনকালে দায়িত্ব পালনে বলতে গেলে কোনো কষ্টই করতে হয়নি। কিন্তুসকাল থেকেই যানবাহনের ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রবণতা এখনো কম বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে গণপরিবহন খুলে দিলেও এখন পর্যন্ত খুলে দেওয়া হয়নি দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পর্যটনকেন্দ্র। এ ছাড়া জনসমাবেশ, সামাজিক ও ধর্মীয় আয়োজনে এখনও নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রেখেছে সরকার। দেশে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলো ইতিমধ্যে চালু হয়েছে।
পরিবর্তী নির্দেশনা না আসলে চালু থাকবে সকল প্রকার শিল্প-কলকারখানা। ব্যাংকগুলোও গতকাল থেকে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করে। সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত লেনদেনের জন্য ব্যাংকগুলোর সকল শাখা খোলা রাখা হয়। আর ব্যাংকারদের অফিসের কাজের জন্য সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ব্যাংকে থাকেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, জীবন ও জীবিকার মধ্যে সমতা আনতে সবকিছু খুলে দেয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে জনসাধারণকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বাধ্য করার কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ফলে স্বাস্থ্যবিধি মানা না গেলে করোনা যে আরো লাগামহীন হবে তা বলাই বাহুল্য।
তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের সুপ্তিকাল ন্যূনতম ১৪ দিন। একটি ধাপ কাভার করতে হলে ন্যূনতম ১৪ দিন লকডাউন বা বিধিনিষেধ কার্যকর করা প্রয়োজন। আর দুটি ধাপ কাভার করতে হলে ন্যূনতম ২৮ দিন এ ব্যবস্থ চালু করা প্রয়োজন। এর বাইরে দিন কমিয়ে লকডাউন হতে পারে- এমন কোনো ধারণা তার নেই। তবে আমাদের দেশে অনেক দীর্ঘ সময় ধরে লকডাউন হয়ে গেছে।
মানুষ যদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলত এবং মাঝে মাধ্যে লকডাউন শিথিল করা না হতো, তাহলে সংক্রমাণ পরিস্থিতি আরো আগে উন্নতি হতো।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, টিকা, স্বাস্থ্যবিধি মানা আর নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, এই তিন উপায়কেই এখন পর্যন্ত বিশ্বে করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই তিন কৌশল একই সঙ্গে প্রয়োগের কথাই জোর দিয়ে বলেন দেশি-বিদেশি সব বিশেষজ্ঞ। কিন্তু বাংলাদেশে সব কটিই চলছে ছন্নছাড়া অবস্থায়।
না মিলছে প্রত্যাশিত পরিমাণে টিকা, মানুষ না মানছে ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি আর না কার্যকর করা যাচ্ছে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা। এর পরিণতিতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এখন দেশে বেপরোয়া। এ অবস্থায় এভাবে বিধিনিষেদ শিথিলতায় আমাদের সংক্রমণ পরিস্থিতি অবশ্যই অগ্রগতি ঘটাবে এবং আমাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়াবে।
উল্লেখ্য, গত ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হয় এই বিধিনিষেধ। তারপর ধাপে ধাপে বাড়ানো হয় এটি। ১৪ জুলাই পর্যন্ত লকডাউন চলার পর কোরবানির ঈদে পশুর হাটে বেচাবিক্রি ও ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে আট দিনের জন্য শিথিল করা হয় লকডাউন। কোরবানির ছুটি শেষে ২৩ জুলাই থেকে আবার শুরু হয় কঠোর বিধিনিষেধ, যা শেষ হয় মঙ্গলবার দিবাগত মধ্যরাতে।


