পেট তো আর লকডাউন মানে না
দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে শুরু হওয়া কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে পেটের দায়ে রাস্তায় বেরিয়েছেন অনেকেই। তারা বলছেন, পেট তো আর লকডাউন মানে না। তাই পেটের দায়ে রাস্তায় বের হতেই হয়। কাজ না করলে সংসার চলবে কী করে। বাসা ভাড়া দেব কীভাবে। কেউ তো কোনো সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসছে না। কারো সহযোগিতাও পাচ্ছেন না তারা।
রোববার (২৫ জুলাই) রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তায় বের হওয়া মানুষের বেশির ভাগই জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়ে বের হয়েছেন। তাদের কেউ দিনমজুর, রিকশাচালক, হকার ও ইজিবাইক চালক।
নবাবগঞ্জ বেড়িবাঁধে গিয়ে দেখা যায়, বেশ কয়েকজন মানুষ কাজের সন্ধানে বসে আছেন। তাদের সবাই দিনমজুর। কিন্তু বেলা গড়িয়ে দুপুর হলেও তাদের কেউই কাজ পাননি। দিনমজুর জুলহাস মিয়া বলেন, গত দুদিন ধরে কাজের সন্ধানে এখানে আসছি। কিন্তু কাজ পাইনি। কাজ না পেলে কী খাব, কী করে সংসার চালাব সেই চিন্তায় পড়েছি। বাসায় খাবার থাকলে এই ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় বের হতাম না। শনির আখড়া আন্ডারপাসের ওপরে গাড়িতে করে মাস্ক বিক্রি করছিলেন শাহজাহান মিয়া।
তিনি বলেন, ঝুঁকি নিয়া বাইর হইছি ঠিকই, কিন্তু বিক্রি নাই। মানুষ নাই বেচমু কার কাছে? আবার না বাইরাইয়াও তো উপায় নাই। সংসার চলব কেমনে? কেউ তো কোন সহযোগিতাও করে না। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ঢালে ইজিবাইক নিয়ে সাইনবোর্ডের যাত্রী ডাকছিলেন চালক মো. হাসান। তিনি বলেন, আমার দুই ছেলে, এক মেয়েসহ ৫ জনের সংসার। লকডাউনের কারণে বড় বিপদে পইড়া গেছি পরিবার নিয়া। ধার-দেনা কইরা কোনোরকমে সংসার চালাইতাছি।
হাসান আরো বলেন, হাইওয়েতে ইজিবাইক চালানো নিষেধ। তারপরও যাত্রীর আশায় আইছি। যে-কোনো সময় পুলিশে ধরতে পারে। ভয়েই অস্থির হয়ে আছি, কী যাত্রী ডাকুম। পুলিশ দেখলে রাস্তা থুইয়া চিপা-চাপায় ঢুকাইয়া দেই। রাজধানীর পুরানা পল্টন এলাকায় ডিজাইন ও ছাপার কাজ করে সংসার ভালোই চলছিল সাইফুল আলমের; দুবেলা দুমুঠো খাবারসহ জীবিকার সংস্থান হচ্ছিল তার দুই কর্মীর।
কিন্তু এপ্রিলের শুরু থেকে করোনাভাইরাস মহামারি নিয়ন্ত্রণে যে লকডাউন চলছে, তাতে পেট চালানোই বড় দায় হয়ে গেছে। অফিস ও বাসা ভাড়াসহ পরিবারের আরো খরচ তো আছেই। সংসার চালাতে হিমশিম সাইফুলকে ধারদেনা করতে হয়েছে অনেক। ধার করে কর্মীদের দুয়েক মাস বেতন দিলেও আর না পেরে কয়েক মাস আগে তাদের ছুটি দিয়েছেন। দফায় দফায় লকডাউনে বিপাকে পড়ার কথা জানিয়ে এই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বলেন, একটা লকডাউনের শেষে কাজকর্ম শুরু করলে আবারো লকডাউন আসছে। আমরা গুছিয়ে ওঠারই সুযোগ পাচ্ছি না।
করোনাভাইরাসের মৃত্যু ও শনাক্তের হার বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ঈদের বিরতি দিয়ে গত শুক্রবার থেকে আবার শুরু হয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ। এ সময় অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাসা থেকে বের হতে নিষেধ করা হয়েছে। বিধিনিষেধ মানাতে পুলিশ, র্যাব, বিজিবির সঙ্গে সেনাবাহিনীও মাঠে আছে। শপিংমল, মার্কেটসহ সব ধরনের দোকানপাট বন্ধ। জরুরি সেবার দপ্তর বাদে অফিস-আদালত আর শিল্পকারখানাও বন্ধ রাখা হয়েছে। ৫ আগস্ট মধ্যরাত পর্যন্ত এই বিধিনিষেধ চলবে।
এই বিধিনিষেধে মিরপুরের উত্তর পীরবাগের বাসিন্দা হাওয়া বিবির দুশ্চিন্তা যেন সবার চেয়ে একটু বেশি। নিজেদের জীবিকার পাশাপাশি কলেজপড়ুয়া মেয়ের শিক্ষাজীবনও যোগ হয়েছে তাদের দুর্ভাবনায়। রাজধানীর একটি কলেজে স্নাতক শেষ বর্ষে পড়ছেন তার দ্বিতীয় মেয়ে; লকডাউনের কারণে বন্ধ থাকায় শেষ মুহূর্তে গিয়ে পড়াশোনায় দীর্ঘ ছেদ পড়েছে এই শিক্ষার্থীর।
স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে ওই এলাকায় একটি চায়ের দোকান চালান হাওয়া বিবি; কষ্টেসৃষ্টে পরিবার চালিয়ে তারা মেয়ের পড়ালেখার খরচ জোগান সেখান থেকে।
লকডাউনের মধ্যে মাঝেমধ্যে দোকান খুললেও পুলিশ আসার ভয় আছে হাওয়া বিবির মনে। তবুও খাবার জোগাতে ঝুঁকি নিয়ে দোকান খুলছেন। তিনি বলেন, পুলিশ আসলে আগে খাবার দিতে বলব, তারপর দোকান বন্ধ করব। এছাড়া আমাদের কিছু করার নাই। লকডাউন না হলে এতদিন মেয়ের পড়ালেখা এতদিন শেষ হয়ে যেত। ও কিছু একটা করতে পারত। এখন তো মনে হচ্ছে লকডাউনের কারণে ওর চাকরির বয়সও শেষ হয়ে যাবে।


