এবার আর ছাড় নয় বাড়িওয়ালাদের
আয়কর রিটার্ন জমার সংখ্যা বাড়াতে মরিয়া হয়ে উঠেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এজন্য ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং রাজউক থেকে জমি ও বাসা-বাড়ির মালিকদের তথ্য সংগ্রহ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শুধু তাই নয়, সেবাধর্মী সরকারি সংস্থা যেমন : ওয়াসা, ডেসকো থেকেও গ্রাহকদের তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এ জন্য এনবিআর চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটি স্টিয়ারিং কমিটি ও কর জরিপের সদস্যকে আহ্বায়ক করে ৪টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটি তথ্য সংগ্রহের কর্মকৌশল ও অনলাইনে রিটার্ন দাখিল ব্যবস্থা প্রবর্তনে কাজ করবে।
এ বিষয়ে বুধবার প্রাক-বাজেট আলোচনায় এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বলেন, করজালের বাইরে থাকা ঢাকার বাড়িওয়ালাদের শনাক্ত করতে কাজ শুরু হয়েছে। সিটি করপোরেশনের হোল্ডিং নম্বর নিয়ে মালিকদের প্রথমে শনাক্ত করা হবে।
পরে তার এনআইডি দিয়ে তিনি টিআইএনধারী কিনা তা বের করা হবে। এ জন্য এমওইউ’র (সমঝোতা স্মারক) কাজ চলমান আছে। এভাবে করজাল বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। করজাল বাড়াতে পারলে ভবিষ্যতে কর হার কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সূত্র জানায়, বর্তমানে আইনি বাধ্যবাধকতা থাকায় নানা প্রয়োজনে মানুষ টিআইএন (করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর) নিচ্ছে। যেমন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা ট্রেড লাইসেন্স করতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা আছে। এ কারণে প্রতিনিয়ত হু হু করে টিআইএনধারীর সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু এর বিপরীতে রিটার্ন জমার সংখ্যা বাড়ছে না। অনেকের করযোগ্য আয় থাকা সত্ত্বেও রিটার্ন জমা দিচ্ছে না।
আবার হয়রানির আতংকেও অনেকে রিটার্ন জমা দিতে ভয় পাচ্ছে। তাই করভীতি দূর করতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনলাইনে রিটার্ন দাখিল প্রবর্তনে কাজ শুরু করা হয়েছে। যাতে ঘরে বসেই করদাতারা হয়রানিমুক্তভাবে রিটার্ন জমা দিতে পারে। এ জন্য ৭ সদস্যের টিম গঠন করা হয়েছে।
সূত্রমতে, ঢাকা শহরসহ বিভাগীয় শহরগুলোর অনেক বাসা-বাড়ির মালিকের রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হলেও সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের অভাবে তারা পার পেয়ে যাচ্ছেন। এ ধরনের ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য সেবাধর্মী সংস্থাগুলোর ডাটাবেজ ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যে গাড়ি নিবন্ধনে জাল টিআইএনের ব্যবহার রোধে বিআরটিএ’র সঙ্গে টিআইএন সার্ভার ইন্টিগ্রেশন করা হয়েছে। একইভাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও উত্তর সিটি করপোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কাছ থেকে জমি, বাসা-বাড়ি ও ফ্ল্যাটের মালিক এবং ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই অথরিটি (ডেসা) ; ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো); ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি); তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন; সাভার, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, চট্টগ্রাম পিডিবি, বাখরাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন কর্তৃপক্ষ, কর্ণফুলী গ্যাস ট্রান্সমিশন লিমিটেডসহ সম্ভাব্য অন্য সব সংস্থা থেকে গ্রাহকদের তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
এ কাজের কৌশল নির্ধারণে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির এক সদস্য বলেন, সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে সিস্টেম ইন্টিগ্রেশনে সমঝোতা চুক্তি (এমওইউ) করা হবে। তার আগে এনবিআর কীভাবে সেই তথ্য ব্যবহার করবে, তা নির্ধারণে কমিটি কাজ করবে। একইসঙ্গে নিজস্ব সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে অনলাইনে রিটার্ন জমা সহজীকরণের কাজ চলছে। এ দুটি উদ্যোগ সফল হলে রিটার্ন জমায় যুগান্তকারী সাফল্য আসবে।
এনবিআরের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশের টিআইএনধারী রয়েছে ৬১ লাখের বেশি। অথচ ২০২১-২২ করবর্ষে রিটার্ন জমা দিয়েছে ২৪ লাখ করদাতা। অর্থাৎ টিআইএনধারীর ৬১ শতাংশ রিটার্ন জমা দেয়নি। অথচ মোটা দাগে করযোগ্য আয় রয়েছে এমন সব টিআইএনধারীর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক।
আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ৩১ ধরনের কাজের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে ১২ ডিজিটের কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) নিতে হবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ঋণপত্র খুলতে; আমদানি-রপ্তানি নিবন্ধন পেতে; সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া বা নবায়ন; দরপত্র জমা; অভিজাত ক্লাবের সদস্যপদ গ্রহণ; জমি, ভবন ও ফ্ল্যাট নিবন্ধন; মোটরসাইকেল-বাস-ট্রাকের মালিকানা পরিবর্তন ও ফিটনেস নবায়ন; চিকিৎসক, প্রকৌশলী, হিসাববিদসহ বিভিন্ন ধরনের পেশাজীবী সংগঠনের সদস্য হতে; কোম্পানির পরিচালক ও স্পনসর শেয়ারহোল্ডার হলে; জাতীয় সংসদ, সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনে প্রার্থী হলে; বাণিজ্যিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ চাইলে। আবার ছেলেমেয়েদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়াতে চাইলে অভিভাবকের টিআইএন নেওয়া বাধ্যতামূলক। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তার মূল বেতন এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন ১৬ হাজার টাকার বেশি হলে টিআইএন নিতে হবে।
বাড়িওয়ালাদের কর ফাঁকি বন্ধে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে আয়কর অধ্যাদেশে নতুন ধারা যুক্ত করা হয়। মাসে ২৫ হাজার টাকার বেশি ভাড়া পেলে ব্যাংক হিসাবে তা জমা দেওয়ার বিধান চালু করা হয়। মূলত রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর বাড়িওয়ালারা কর ফাঁকি বন্ধে এ উদ্যোহ নেওয়া হয়। কিন্তু এই আইন বহাল থাকলে তা ফলপ্রসূ হয়নি।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, এটি খুবই ভালো উদ্যোগ। রিটার্ন জমা বাড়াতে যুগান্তকারী সাফল্য দেবে। তবে তার আগে এনবিআরকে অটোমেশন করতে হবে। রিটার্ন বাড়াতে অটোমেশনের বিকল্প নেই। তিনি আরও বলেন, শুধু রিটার্ন জমা বাড়ালেই হবে না। এর সঙ্গে করদাতা রিটার্নে প্রকৃত তথ্য দিচ্ছে কি না তাও খুঁজে বের করতে হবে। এটি করা সম্ভব সরকারি সব সংস্থা থেকে তথ্য প্রাপ্তির মাধ্যমে। এক্ষেত্রে ‘ইনফরমেশন ইজ মানি’। কোনো করদাতা যদি জানেন এনবিআর তার সম্পদ বা আয়ের ৮০ শতাংশও তথ্য জানে, তাহলে কর আদায় বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।


