দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়েতে যান চলাচল শুরু
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুজিববর্ষের প্রাক্কালে যাত্রাবাড়ী-মাওয়া-পাচ্চর-ভাঙ্গা রুটে দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধন করেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে নির্মিত বিশ্বমানের এ এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধন করেন তিনি।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর জনগণের নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা সংবলিত ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্প কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানের এই এক্সপ্রেসওয়ে দুটি সার্ভিস লেনের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীকে যুক্ত করবে। এখন মাত্র ২৭ মিনিটে ঢাকা থেকে মাওয়া যাওয়া যাবে। বরিশাল বিভাগের ছয় জেলা, খুলনা বিভাগের দশটি এবং ঢাকা বিভাগের ছয় জেলাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২২টি জেলার মানুষ সরাসরি এই এক্সপ্রেসওয়ে থেকে উপকৃত হবেন। এ হাইওয়েতে আগামী ২০ বছরের জন্য ক্রমবর্ধমান ট্রাফিকের পরিমাণ বিবেচনা করে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে প্রায় ১১০০৩ দশমিক ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মিত হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটি দেশের প্রথম নিয়ন্ত্রিত এক্সপ্রেসওয়ে।’ এটিকে জাতির জন্য মুজিববর্ষের উপহার বলেও উল্লেখ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই এক্সপ্রেসওয়ে ধরে যানবাহনগুলো কোনো ধরনের বাধা বা ট্রাফিক সিগন্যাল ছাড়াই সরাসরি গন্তব্যে যেতে পারবে। এর পাশাপাশি আশপাশের এলাকার জনসাধারণের যাতায়াতের জন্য ধীরগতির যানবাহন চলাচলের পৃথক লেন নির্মাণ করা হয়েছে।’
শেখ হাসিনা স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘একসময় এ ভাঙ্গা পর্যন্ত যেতে হলে স্টিমার বা লঞ্চে যেতে হতো। আর আমাদের গোপালগঞ্জ যেতে স্টিমারেই ২৪ ঘণ্টা লাগত। লঞ্চে সময় লাগত আরও বেশি। এমনকি ১৯৮১ সালে যখন দেশে ফিরে আসি তখনো সেই অবস্থাই ছিল।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু সড়ক নয়, নৌ, বিমান ও রেলপথেরও উন্নয়ন করছে তার সরকার। শেখ হাসিনা এ সময় নিজস্ব অর্থায়নে তার সরকারের পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে উল্লেখ করে বলেন, ‘আপনারা জানেন, এই পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংক আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিল। আমি সেটা নিয়ে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম। কানাডার কোর্টে প্রমাণ হয়, সেখানে কোনো দুর্নীতি হয়নি। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় সম্মানের।’ প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘পদ্মা সেতুটা একটি ভিন্নধর্মী দোতলা সেতু হচ্ছে। নিচ দিয়ে রেল যাবে এবং ওপর দিয়ে গাড়ি যাবে।’
প্রকল্পের বিবরণ অনুসারে, এক্সপ্রেসওয়েতে ৫টি ফ্লাইওভার, ১৯টি আন্ডারপাস এবং প্রায় ১০০টি সেতু ও কালভার্ট রয়েছে, যা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়িয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখবে। এটিতে মাওয়া থেকে ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা এবং ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাচ্চর থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত দুটি এক্সপ্রেসওয়ে পুরো খুলনা ও বরিশাল বিভাগ এবং ঢাকা বিভাগের একটি অংশের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ঢাকা শহর এবং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের মধ্যে যোগাযোগ জোরদার করবে।
আধুনিক এই এক্সপ্রেসওয়ের দুটি অংশ ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতুর সঙ্গে সংযুক্ত হবে, যা বর্তমানে নির্মাণাধীন। দেশের দীর্ঘতম পদ্মা সেতুর চার কিলোমিটার গত মঙ্গলবার ২৬তম স্প্যান বসানোর পরে ইতিমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। ২০২১ সালের জুনের মধ্যে ট্রাফিকের জন্য ব্রিজটি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হয়ে গেলে ভাঙ্গা থেকে ঢাকা যাতায়াতের জন্য এক ঘণ্টা সময়ও লাগবে না।
প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে ওয়েস্টার্ন বাংলাদেশ ব্রিজ ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পের আওতায় খুলনা, বরিশাল ও গোপালগঞ্জ সড়ক জোনে নির্মিত ২৫টি সেতু এবং তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু নির্মাণ (সংশোধিত) প্রকল্পের আওতায় ৬ লেনবিশিষ্ট ৮ কিলোমিটার তৃতীয় কর্ণফুলী (শাহ আমানত সেতু) সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক উদ্বোধন করেন।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যৌথভাবে ২০১৬ সালে চারটি জেলা ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর এবং ফরিদপুরে এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু করে এবং এটি নির্ধারিত সময়সীমার তিন মাস আগে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে। নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার নির্ধারিত সময়সীমা ছিল ২০২০ সালের ২০ জুন।
৫৫ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়েতে এক্সপ্রেসওয়ের পাঁচটি ফ্লাইওভারের মধ্যে একটি ২.৩ কিলোমিটার কদমতলী-বাবুবাজার লিংক রোড ফ্লাইওভার রয়েছে। অন্য চারটি ফ্লাইওভার হলো আবদুল্লাহপুর, শ্রীনগর, পুলিয়াবাজার এবং মালিগ্রামে। এই এক্সপ্রেসওয়েতে জুরাইন, কুচিয়ামোড়া, শ্রীনগর ও আটিতে চারটি রেলওয়ে ওভারব্রিজ রয়েছে এবং চারটি বড় সেতু রয়েছে যার মধ্যে ৩৬৩ মিটার ধলেশ্বরী-১, ৫৯১ মিটার ধলেশ্বরী-২, ৪৬৬-মিটার আড়িয়াল খাঁ এবং ১৩৬-মিটার কুমার সেতু।
অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম প্রকল্প বিষয়ে তথ্যচিত্র উপস্থাপন করেন।
রেলপথমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজন, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা এবং পিএমওর এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক জুয়েনা আজিজ, পিএমও সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, প্রেস সচিব ইহসানুল করিমসহ অন্যরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
করোনার উপসর্গ দেখা দিলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন : প্রধানমন্ত্রী করোনাভাইরাস সম্পর্কে সঠিকভাবে নির্দেশনা অনুসরণের জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি গতকাল দুপুরে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মুজিববর্ষ, ২০২০ উদযাপন উপলক্ষে ‘পরিচ্ছন্ন গ্রাম-পরিচ্ছন্ন শহর’ কর্মসূচির আওতায় দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের উদ্বোধনকালে এ কথা বলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘করোনাভাইরাস এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে এখানে হয়তো মৃতের সংখ্যা তেমন না কিন্তু আতঙ্ক অনেক বেশি। কাজেই এই প্রাণঘাতী ভাইরাস থেকে দেশকে মুক্ত রাখতে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা সঠিকভাবে অনুসরণ করতে হবে।’ করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) বাংলাদেশে যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য সরকার সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
করোনাভাইরাসের কোনো উপসর্গ দেখা দিলে সেটা লুকিয়ে না রেখে অবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যদি কেউ কখনো মনে করেন যে কেউ এ ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন বা তার কোনোরকম নমুনা দেখা দিচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে আপনাদের ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।’
শেখ হাসিনা বিদেশ থেকে আসাদের নিজস্ব উদ্যোগেই নিজেদের ‘কোয়ারেন্টাইনে’ থাকারও পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘যারা বিদেশ থেকে আসবেন তারা নিজেরা অন্তত বাইরের কারও সঙ্গে মিশবেন না এবং কিছুদিন অপেক্ষা করে দেখবেন এ ধরনের রোগের কোনোরকম লক্ষণ দেখা যায় কি না। প্রয়োজনে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন।’
সরকারপ্রধান বিদেশ থেকে আসা ও প্রবাস থেকে ফেরা ব্যক্তিদের সম্পর্কে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘বিদেশ থেকে কেউ এলে তার সঙ্গে মিশবেন না। তাকে অন্তত কিছুদিন আলাদা থাকতে দেবেন।’
দেশে ইতিমধ্যে করোনাভাইরাস আক্রান্ত ও চিকিৎসাধীনদের স্বাস্থ্যের উন্নতির তথ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমরা বিদেশ থেকে আসা আমাদের দুজন নাগরিককে শনাক্ত করেছি (করোনাভাইরাস আক্রান্ত)। তাদের চিকিৎসা করা হয়েছে, তারা মোটামুটি ভালো এবং একজন সংক্রমিত হয়েছিল। এছাড়া বাকি সবাই ভালো আছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষ খুব অসচেতন। তারা যেখানে সেখানে থুতু ফেলছে। টিস্যু বা রুমাল ব্যবহার করে যেখানে সেখানে ছুড়ে ফেলছে। বাইরে থেকে ঘরে এসে হাত না ধুয়ে ছেলেমেয়েকে স্পর্শ করছে, বিভিন্ন কিছু করছে।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘যে যে কাজগুলো করলে তার মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায় সে কাজগুলো করবেন না। যেখানে সেখানে কফ, থুতু ফেলবেন না। হাঁচি-কাশি দিলে রুমাল বা টিস্যু ব্যবহার করবেন। নিজে ভালো থাকবেন, অন্যকে ভালো রাখবেন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সবাইকে অনুরোধ করব, হাঁচি-কাশি এলে আপনারা হাতের তালুতে না নিয়ে কনুইয়ের মাধ্যমে করেন। হাত মেলানো, কোলাকুলি করা বা কাউকে জড়িয়ে ধরা, এগুলো সব বন্ধ রাখতে হবে। বাইরে থেকে ঘরে ফিরে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলবেন। কখন কার মধ্যে যে এই রোগ আছে, কার মাধ্যমে চলে আসে এটা কেউ বলতে পারে না।’ যানবাহনে ময়লা রাখার জন্য ঝুড়ি বা থলে রাখারও পরামর্শ দেন তিনি।
শেখ হাসিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘আমাদের সবাইকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। নিজেরা যদি এমনটা থাকি তাহলে আমরা রোগ থেকে মুক্ত থাকতে পারব। আর আমাদের পবিত্র ধর্মেও রয়েছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার কথা।’
বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি ভালো থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, এটা মহামারী আকারে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ এখনো ভালো আছে, ঘাবড়ানোর কিছু নেই। কিন্তু এটা থেকে ভালো থাকার জন্য আমাদের আরও সচেতন হতে হবে।’
জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম, নবনির্বাচিত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী পরে রাজশাহী ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এবং যশোর পৌরসভার মেয়রের সঙ্গে ভিডিওর মাধ্যমে মতবিনিময় করেন। এ সময় তিনি যশোরের মতো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইকেল ব্যবস্থা গড়ে তুলে গ্যাস উৎপাদন প্রকল্প চালুর জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানান।


