English Version
আপডেট : ২৬ নভেম্বর, ২০১৯ ১১:৪২
সূত্র:

বায়ুদূষণ অসহনীয় পর্যায়ে, মারাত্মক মৃত্যুঝুঁকি

বায়ুদূষণ অসহনীয় পর্যায়ে, মারাত্মক মৃত্যুঝুঁকি

বিশ্বের যে পাঁচটি দেশের শতভাগ মানুষ দূষিত বায়ুর মধ্যে বসবাস করে, তার একটি বাংলাদেশ। চলতি বছরের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে প্রকাশিত বৈশ্বিক বায়ুদূষণের ঝুঁকিবিষয়ক ‘দ্য স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের বায়ুর মান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানমাত্রার চেয়ে অনেক নিচে।

বায়ুদূষণের কারণে মানুষের গড় আয়ু কমে যাওয়া ও স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে, এ সময়ে জন্ম নেয়া শিশুদের গড় আয়ু কমবে ২০ মাস।

বায়ুদূষণজনিত কারণে মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ পঞ্চম। বায়ুদূষণের কারণে ২০১৭ সালে দেশে মারা গেছে ১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ।

চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এয়ারভিজ্যুয়ালের প্রকাশিত ‘বিশ্ব বাতাসের মান প্রতিবেদন ২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে সবচেয়ে বায়ুদূষণের কবলে থাকা রাজধানী শহরগুলোর তালিকায় ঢাকার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। রাজধানীতে শহরের বাতাসে ক্ষুদ্র বস্তুকণার পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বেধে দেয়া মাত্রার চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশের ৯০ ভাগ মানুষের মৃত্যুর কারণ বায়ুদূষণ। প্রতি বছর বিশ্বে বায়ুদূষণের কারণে অন্তত ৭০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। গত বছরের শেষ দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দাবি করে, মাত্রাতিরিক্ত বায়ুদূষণে বিশ্বের ১০ ভাগ মানুষের মধ্যে ৯ ভাগ মানুষই বায়ুদূষণের শিকার। মাত্রাতিরিক্ত বায়ূদূষণের মধ্যে বসবাস করার ফলে ফুসফুস ক্যান্সার, স্ট্রোক, হার্টের অসুখের মধ্যে পড়ছে বলেও জানিয়েছিল সংস্থাটি।

ডাক্তারদের মতে, বায়ুদূষণ নানা রোগের সৃষ্টি করে। বায়ুতে অক্সিজেনের চেয়ে কার্বন ডাই-অক্সাইড বা অন্য ক্ষতিকারক উপাদানের পরিমাণ বেড়ে গেলে তা জীব দেহের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দূষিত বায়ু একজন মানুষকে অসুস্থ করে দেয়। যা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। বায়ুদূষণের ফলে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এ থেকে ক্যান্সার ও শ্বাসজনিত রোগসহ বিভিন্ন রোগ ছাড়াতে পারে। ইটভাটা থেকে বিষাক্ত নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড ও সালফার ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয়। এ গ্যাস দুটি অ্যাজমা ও হাঁপানি বাড়িয়ে দেয়। ফুসফুসের স্বাভাবিক কার্যক্রম কমিয়ে দেয়। অ্যালার্জি সমস্যা, নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ বাড়িয়ে দেয়।

বায়ুতে ধুলাদূষণ অর্থাৎ বালুকণা বায়ুতে ছড়িয়ে পড়লে ফুসফুসে ক্যান্সারের আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। রাস্তার পাশের দোকানের খাবারে ও ফুটপাতে বিক্রিত খাবারে বায়ুর মাধ্যমে ধুলা মিশে যাচ্ছে। ধুলার সঙ্গে মিশছে নানা ধরনের রোগ জীবাণু। এর ফলে আমাশয়, ডায়রিয়া ও পেটের পীড়াসহ নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। আর যারা বালুর কাজ করে বা যেখানকার বাতাসে বালুকণা ভেসে বেড়ায় সেখানকার মানুষের স্লিকোসিস নামে একটি রোগ হতে পারে। যা ফুসফুসকে শক্ত করে দেয়। আর ধূমপানের কারণে শুধু ধূমপায়ীই নয় তার আশপাশের মানুষও শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণের মাধ্যমে স্টোক, ফুসফুসে ক্যান্সারের শিকার হচ্ছে। সালফার-ডাই-অক্সাইড শ্বাসনালিতে প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং ব্রঙ্কাইটিস, পালমোনারি এমফিসেমা, হাঁপানিসহ শ্বাসযন্ত্রের বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি করে। কার্বন মনোঅক্সাইড গ্যাস রক্তের হিমোগ্লোবিনের সঙ্গে দ্রুত মিশে রক্ত কণিকার অক্সিজেন পরিবহন ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে বাতাসের সঙ্গে এটি দেহে বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা মহিলা, শিশু এবং বৃদ্ধ বয়সের মানুষের শ্বাসরোগসহ হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। সর্বোপরি, বহু মানুষের অকাল মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায় এ বায়ুদূষণ।

সোমবার (২৫ নভেম্বর) বিকেলে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ঢাকার বায়ু ও শব্দ দূষণ বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন জানান, বাংলাদেশে বায়ু দূষণের উৎস নিয়ে চলতি বছরের মার্চে একটি গবেষণা প্রকাশ করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিশ্বব্যাংক। তাতে দেখা যায়, দেশে বায়ু দূষণের প্রধান তিনটি উৎস হচ্ছে- ইটভাটা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া ও নির্মাণকাজ। আট বছর ধরে এ তিন উৎস ক্রমেই বাড়ছে।

২০১৩ সালে পরিসংখ্যান ব্যুরো থেকে দেশের ইটভাটাগুলোর ওপর একটি জরিপ করা হয়। তাতে দেখা যায়, দেশে ইটভাটার সংখ্যা ৪ হাজার ৯৯৫টি। ২০১৮ সালে পরিবেশ অধিদফতরের জরিপে দেখা যায়, ইটভাটার সংখ্যা বেড়ে ৭ হাজার ৯০২টি হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৪৮৭টি ইটভাটা ঢাকা বিভাগের মধ্যে গড়ে উঠেছে। ওই গবেষণার তথ্যানুযায়ী, ২০১০ সালে দেশে মোট যানবাহনের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৭৭। ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ১৯ হাজার ৬৫৪।

মন্ত্রী জানান, প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএন’র এ দেশীয় পরিচালক রাকিবুল আমিনের মতে, বায়ু দূষণ মোকাবিলার প্রথম কাজ হচ্ছে দূষণের উৎস বন্ধ করা। দ্বিতীয় কাজ হচ্ছে, শহরের বিভিন্ন স্থানে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা এবং জলাশয়গুলো রক্ষা করা। এ দূষিত বায়ুর মধ্যে নগরের মানুষ কীভাবে নিরাপদ থাকবে, সে ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। তবে সবার আগে বায়ু দূষণকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কট হিসেবে দেখতে হবে।