ঈদযাত্রায় দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক
সংস্কারকাজ চলায় সিরাজগঞ্জ-রাজশাহী মহাসড়কের এক লেন পুরোপুরি বন্ধ। ভারি বর্ষণ ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সিরাজগঞ্জের খালকুলা থেকে কাছিকাটা পর্যন্ত প্রায় নয় কিলোমিটার সড়কে চলছে জরুরি সংস্কারকাজ। সংস্কারকাজের কারণে এক পাশ বন্ধ থাকায় সড়কের অন্য পাশে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কের যানজট ১৫ কিলোমিটার পর্যন্তও ছড়িয়ে পড়ছে। ঈদযাত্রায় গাড়ির চাপ যত বাড়ছে, যানজটও তত তীব্র হচ্ছে।
সংস্কারকাজ চলছে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল গোলচত্বর থেকে চান্দাইকোনা, শাহজাদপুর, নলকা ও নাটোরের বনপাড়াতেও। সিরাজগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, দু-একদিনের মধ্যেই শেষ হবে কাজ। তখন আর সমস্যা থাকবে না।
ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের বগুড়ার শাকপালা এলাকায় ১০০ মিটারের বেশি অংশে উঠে গেছে পিচ। জরুরি সংস্কার হিসেবে এখানে কেবল ইট বিছিয়ে দিয়েই দায় সেরেছে বগুড়া সড়ক বিভাগ। শহরের তিনমাথা মোড়, মহাস্থানসহ অন্তত ১২-১৫টি স্থানে মহাসড়কের পিচ তুলে ইট বিছিয়ে কোনো রকমে যানবাহন চলাচল উপযোগী করা হয়েছে। এসব অংশে যানবাহন চলছে ধীরগতিতে। গাড়ির চাপ বাড়লেই দেখা দিচ্ছে যানজট। গতকাল থেকে তা প্রকট হতে শুরু করেছে। তবে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে প্রকৌশলীরা কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন বগুড়া সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাদেকুল ইসলাম।
বেহাল দশা আরেক গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক ঢাকা-সিলেটেরও। সিলেট বাস টার্মিনাল থেকে শেরপুর এলাকা পর্যন্ত অন্তত ২৭ কিলোমিটার অংশের অবস্থা খুবই নাজুক। রয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত। কোথাও কোথাও পিচ উঠে ইট বেরিয়ে এসেছে। এখন পর্যন্ত যানজট না হলেও সড়কটির এ অংশে গাড়ি চলছে থেমে থেমে। তবে সিলেট সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রিতেশ বড়ুয়ার আশঙ্কা, বৃষ্টি হলে আরো খারাপ অবস্থায় চলে যাবে সড়কটি।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ছিল, ঈদের অন্তত সাতদিন আগেই বন্যা-বর্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক-মহাসড়ক মেরামত সম্পন্নের। পরে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মেরামতকাজ ঈদের তিনদিন আগে শেষ করার নির্দেশ দেন। এ হিসাবে আজ বৃহস্পতিবারের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক-মহাসড়কগুলোর মেরামতকাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা। তবে বাস্তব চিত্র উল্টো। বেশির ভাগ অংশেই এখনো চলছে সংস্কারকাজ। আর যেগুলোয় সংস্কার হয়েছে, সেগুলোয় দায়সারা কাজের অভিযোগ উঠছে। ভাঙাচোরা সড়কে দুর্ভোগকে সঙ্গী করেই ঘরে ফিরছে মানুষ।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় বন্যা তথ্যকেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, চলমান বন্যায় দেশের ২১ জেলায় ৬৩৫ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে জেলা সড়ক আছে ১২০ কিলোমিটার। আঞ্চলিক মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫২ কিলোমিটার। এর বাইরে ৪০৫ কিলোমিটার জেলা মহাসড়ক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তথ্যকেন্দ্রের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় সবচেয়ে বেশি সড়ক-মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সিরাজগঞ্জ সড়ক বিভাগে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের পরিমাণ ১৮৫ দশমিক ৭৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৩৪ কিলোমিটার জাতীয় ও ১৫২ কিলোমিটার জেলা সড়ক।
সিরাজগঞ্জ সড়ক বিভাগের ওপর দিয়ে জাতীয় মহাসড়ক এন-৪ ও এন-৫-এর চারটি অংশ। সব মিলিয়ে এর দৈর্ঘ্য ৫৬ কিলোমিটার, যার মধ্যে ৩৪ কিলোমিটার অংশই চলমান বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এসব সড়ক মেরামতে কী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে জানতে চাইলে সিরাজগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করা হয়েছে। যেসব স্থানে গর্ত তৈরি হয়েছিল, সেগুলোয় ইট-খোয়া-বালি দিয়ে সংস্কার করা হয়েছে। সড়কটিতে বর্তমানে যান চলাচলে তেমন সমস্যা হচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিছুটা সমস্যা হচ্ছে নলকা সেতু এলাকায়। এ সেতুটি তুলনামূলক সরু। তার ওপর আবার এক্সপানশন জয়েন্টে সমস্যা রয়েছে। এ কারণে সেতুর ওপর দিয়ে ধীরগতিতে যানবাহন পারাপার হচ্ছে।
বণিক বার্তার সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, হাটিকুমরুল থেকে চান্দাইকোনা পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার মহাসড়কের প্রায় ১২ কিলোমিটার রাস্তার
অবস্থা খুবই খারাপ। খানাখন্দ ও বড় বড় গর্তের কারণে যান চলাচলের প্রায় অযোগ্য হয়ে উঠছে সড়কটি। একইভাবে হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়কের হাটিকুমরুল মোড় থেকে খালকুলা হয়ে মান্নাননগর পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার রাস্তায় খানাখন্দের সৃষ্টি হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়ছেন যানবাহনের চালক ও যাত্রীরা। ঈদের আগে সংস্কারকাজ শেষ না হলে ভোগান্তি তীব্র হওয়ার আশঙ্কায় আছেন তারা। এর আগে গত ঈদুল ফিতরেও প্রায় ২৫ কোটি টাকা খরচ করে মহাসড়কটি সংস্কার করা হয়েছিল। তবে নিম্নমানের কাজ হওয়ায় সেই সংস্কার দুই মাসও টেকেনি।
চলমান বন্যায় রংপুর সড়ক বিভাগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৮৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার, যার মধ্যে ৪৪ কিলোমিটারই জেলা সড়ক। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলোর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে রংপুর সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী একেএম শফিকুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, এ সড়ক বিভাগের ক্ষতিগ্রস্ত সব সড়ক-মহাসড়কের মেরামতকাজ এক সপ্তাহ আগেই শেষ হয়েছে। সড়ক বিভাগের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় মেরামতকাজ পরিচালিত হওয়ায় দ্রুত তা শেষ করা সম্ভব হয়েছে।
বণিক বার্তার সিলেট প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সিলেট বাসস্ট্যান্ড থেকে শেরপুর পর্যন্ত প্রায় ২৭ কিলোমিটার সড়ক বেহাল দশায় রয়েছে। গত সপ্তাহে মেরামত করা হলেও বৃষ্টির কারণে কাজের মান সন্তোষজনক হয়নি। বৃষ্টিপাত বাড়লে মহাসড়কটি ফের আগের দশায় চলে যেতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রকৌশলীরা। এর বাইরে সিলেট-তামাবিল, সিলেট-জাফলংসহ অন্যান্য সড়ক-মহাসড়কের অবস্থা আরো করুণ অবস্থায় রয়েছে। যেগুলোর কারণে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছে মানুষ।
কেন্দ্রীয় বন্যা তথ্যকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, গাইবান্ধা সড়ক বিভাগে বন্যা ও ভারি বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের পরিমাণ ১২২ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার। একইভাবে কুড়িগ্রাম সড়ক বিভাগে ৭২ দশমিক ৪, জামালপুর সড়ক বিভাগে ৩৯ দশমিক ৮৫, নেত্রকোনা সড়ক বিভাগে ৬ দশমিক শূন্য ৫, কিশোরগঞ্জ সড়ক বিভাগে দশমিক ৬, ময়মনসিংহ সড়ক বিভাগে ২ দশমিক ৫, বান্দরবান সড়ক বিভাগে ১৮ দশমিক ৭, দোহাজারী সড়ক বিভাগে ৪০, চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগে ২০, লালমনিরহাট সড়ক বিভাগে দশমিক ৩৭, মৌলভীবাজার সড়ক বিভাগে ২ দশমিক ৩৩, সিলেট সড়ক বিভাগে ১০, শেরপুর সড়ক বিভাগে ১৬, সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগে ৩০, হবিগঞ্জ সড়ক বিভাগে ৭, ফরিদপুর সড়ক বিভাগে ২, বাগেরহাট সড়ক বিভাগে ১ দশমিক ৪, ফেনী সড়ক বিভাগে ১২ ও বগুড়া সড়ক বিভাগে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১৩ কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়ক। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক-মহাসড়কের তথ্য গতকাল ৭ আগস্ট পর্যন্ত। বন্যা তথ্যকেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিদিনই ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের তথ্য হালনাগাদ হচ্ছে এবং পরিমাণ বাড়ছে।
এখনো বন্যার পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে ১৫১ কিলোমিটার সড়ক। আর বন্যায় ওয়াশআউট হওয়া সড়কের পরিমাণ প্রায় আড়াই কিলোমিটার। দুটি ব্রিজ, চারটি বক্স কালভার্ট ও একটি পাইপ কালভার্টও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গতকাল সিরাজগঞ্জ, রংপুর, ময়মনসিংহ, বগুড়া, গাইবান্ধা, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, সিলেট ও খুলনা সড়ক বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীদের সঙ্গে সড়ক মেরামত বিষয়ে কথা বলে বণিক বার্তা। প্রকৌশলীরা জানান, জরুরি ভিত্তিতে সড়কগুলো সংস্কার হয়েছে, যেটা রুটিন মেইনটেন্যান্স কাজের অংশ হিসেবে করা। বেশির ভাগ জায়গায় সড়ক বিভাগের কর্মীরা নিজেরাই কাজ করেছেন। যেসব জায়গায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের পরিমাণ বেশি ছিল, সেসব জায়গায় মেরামতকাজ করা হয় ঠিকাদারদের দিয়ে। যেসব কাজ করা হয়েছে, তার সবগুলোয় সাময়িক পদক্ষেপ হিসেবে। যান চলাচল স্বাভাবিক রাখাই আপাতত সড়ক বিভাগগুলোর মূল উদ্দেশ্য। প্রতিটি সড়ক বিভাগেই স্থায়ী মেরামতের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। বরাদ্দ অনুযায়ী অর্থছাড় হলে স্থায়ী সংস্কারকাজে হাত দেবে সড়ক বিভাগগুলো।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সওজ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (প্ল্যানিং অ্যান্ড মেইন্টেন্যান্স উইং) আশরাফুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, বন্যাপরবর্তী সময়ে যত দ্রুত সম্ভব ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামত করে চলাচলের উপযোগী করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। বন্যা মোকাবেলায় আমাদের সক্ষমতা বেড়েছে। অর্থ বরাদ্দেও কোনো কমতি নেই। তবে কিছু এলাকা এখনো বন্যার পানিতে তলিয়ে আছে। পানি না কমা পর্যন্ত সেখানে মেরামত কাজ করা কঠিন।


