English Version
আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১৩:৩৬
সূত্র:

ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিকরা হাওয়া, খুঁজছে পুলিশ

ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিকরা হাওয়া, খুঁজছে পুলিশ

চকবাজারের আগুনের ঘটনায় আলোচিত নাম হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের দুই মালিককে খুঁজছে পুলিশ। হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের বিভিন্ন তলায় দাহ্য পদার্থের গুদাম ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ আছে। ভবনটিতে প্রচুর দাহ্য পদার্থ মজুত থাকায় সড়কে আগুনের সূত্রপাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা আশপাশের ভবনগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬৭ জন।   আলোচিত এইএরপর উত্তরাধিকার সূত্রে ভবনটির মালিকানা পান তার দুই ছেলে হাসান ও সোহেল। ভবনটির দেখভাল করতেন হাসান। তিনি পরিবার নিয়ে ওই ভবনেই থাকতেন। আগুনের তাণ্ডব থেকে এই পরিবারের সদস্যরা রক্ষা পেলেও ঘটনার চার দিন পরও ঘটনাস্থলে তাদের উপস্থিতি দেখা যায়নি। তারা এখন কোথায় আছেন, তাও বলতে পারছেন না স্থানীয়রা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ২০ বছর আগে হাজী ওয়াহেদ ম্যানশন নামের ভবনটি তৈরি করা হয়। ভবনটির মালিক ছিলেন হাজী ওয়াহিদ। এরশাদের আমলে তিনি ছিলেন ওই এলাকার ওয়ার্ড কমিশনার। প্রায় একযুগ আগে হাজী ওয়াহিদ মারা যান। এরপর হাজী ওয়াহিদের দুই ছেলে হাসান ও সোহেল ভবনটির মালিকানা পান। সোহেল প্রায় সময়ই চট্টগ্রামে থাকতেন। আর হাসান তার পরিবার নিয়ে ওই ভবনেই থাকতেন। ওয়াহেদ ম্যানশনের দেখভালের দায়িত্বও ছিল তার ওপরে।

বাসিন্দারা আরও জানায়, মো. হাসান (৫০) ও মো. সোহেল ওরফে শহীদ (৪০) দুজনেই নিরাপদে আছেন।

অগ্নিকাণ্ডে নিহত ওয়াসিউদ্দীন মাহিদের বাবা নাসিরউদ্দীন জানান, তিনি শুনেছেন, ঘটনার দিন মো. হাসান সপরিবার ঢাকার বাইরে ছিলেন। তারা আগে থেকেই চট্টগ্রামে বেড়াচ্ছিলেন। রাতে আগুন লাগার পর আরেক মালিক মো সোহেল ওরফে শহীদ ও তার মা বেরিয়ে যান। নাসিরউদ্দীন ছেলের খোঁজে বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন এবং তিনি নিজেই তাদের দেখেছেন।

ওয়াহেদ ভবন স্থানীয়দের দাবি, ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে কেমিক্যালের যে গুদাম রয়েছে সেটির মালিক সোহেল। ঘটনার দিন দুই ছেলের মধ্যে একজন কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন। অন্যজন বাসার বাইরে ছিলেন। তবে আগুনের ঘটনায় পরিবারের লোকেরা সবাই অক্ষত থাকলেও তারা গা-ঢাকা দিয়ে আছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

ভবনটির কার পার্কিং, নিচতলা ও দ্বিতীয় তলায় কেমিক্যালের গুদাম রয়েছে। ওপরের তলাগুলো ছিল আবাসিক। সড়কে আগুনের সূত্রপাতের সঙ্গে সঙ্গে নিচতলা ও দ্বিতীয় তলার গুদামে আগুন পৌঁছে যায়। মুহূর্তে তা ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের আরও পাঁচটি ভবনে।

প্রায় ১০ কাঠা জমির ওপরে গড়ে ওঠা ভবনটি নির্মাণে ‘ইমারত নির্মাণ বিধিমালা’ বা রাজউকের কানও আইন মানা হয়নি। সরেজমিন পরিদর্শণে দেখা যায়, ভবনের চারপাশে নেই কোনও উন্মুক্ত জায়গা। বিশাল ভবনটিতে ওঠানামার জন্য একটি মাত্র সিঁড়ি রয়েছে। কার পার্কিংয়ের জায়গাটিও ব্যবহার করা হচ্ছে গুদাম হিসেবে। এই ভবনটির বিষয়ে বৈধ কোনও কাগজপত্রও নেই রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কাছে।

চুড়িহাট্টায় আগুনের ঘটনায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রাথমিক তদন্তেও বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। বাড়িটি আইন মেনে নির্মাণ করা হয়নি বলেই মনে করে এ কমিটিও।

এ বিষয়ে ওয়াহেদ ভবনডিএসসিসি’র তদন্ত কমিটির সদস্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের প্রফেসর ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন ভবন পরিদর্শনকালে দেখেছি পাঁচটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবনগুলো বিল্ডিং কোড মেনে নির্মাণ করা হয়নি। ওয়াহিদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলার পুরোটাতেই গুদাম ছিল। অন্যান্য ভবনগুলোতে কম বেশি গুদাম ছিল। এটি একটি বড় ভবন হওয়া সত্ত্বেও আগুন নেভানোর জন্য কোনও ইক্যুইপমেন্ট ছিল না। একটি মাত্র সিঁড়ি রয়েছে, যা পর্যাপ্ত নয়। আগুনের সূত্রপাত যে কারণেই হোক না কেন, কেমিক্যালের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়েছে।’

ভবনটির বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের অথরাইজড অফিসার নুরুজ্জামান জাহিদ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘ওয়াহিদ ম্যানশনসহ অন্যান্য ভবনগুলো রাজউকের অনুমোদিত কিনা আমরা সে বিষয়ে এখনও কোনও তথ্য নিতে পারি নাই। ওদের সঙ্গে কথা বলে জানা যাবে আসলে তারা অনুমোদন নিয়ে ভবন নির্মাণ করেছেন কিনা। এই সমস্যাটি পুরান ঢাকার দীর্ঘদিনের সমস্যা।’

এ প্রসঙ্গে ডিএসসিসি’র স্থানীয় কাউন্সিলর মো. আনোয়ার পারভেজ বাদল বলেন, ‘ওয়াহিদ সাহেব ভালো লোক ছিলেন। কয়েক বছর আগে তিনি মারা গেছেন। আসলে বাসাবাড়িতে মালামাল মজুত করে রাখা পুরান ঢাকার বড় সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানে সিটি করপোরেশন কাজ করছে।’

চকবাজারের চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত এক ব্যক্তির ছেলের করা মামলায় তাঁরা দুজন আসামি। তবে গতকাল শনিবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) রাত পর্যন্ত তাঁদের অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) রাতে চকবাজার থানায় মো. আসিফ বাদী হয়ে হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের দুই মালিক মো. হাসান, মো. শহীদসহ ১০-১২ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেন। মো. আসিফের বাবা মো. জুম্মন চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন। আসিফ মামলার এজাহারে বেপরোয়া বা তাচ্ছিল্যপূর্ণ কাজ করে মৃত্যু ঘটানো, ঘরবাড়ি ধ্বংসের জন্য আগুন বা বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যবহার, উপাসনালয়, মানুষের বসতি বা সম্পত্তি রাখা হয়, এমন দালান ধ্বংস ও লোকসানের অভিযোগ এনেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের চারতলা ভবনের বিভিন্ন তলায় ভবনমালিক দাহ্য পদার্থের গুদাম ভাড়া দিয়েছিলেন। আর্থিকভাবে লাভবান হতে তাঁরা আবাসিক এলাকার ভবনে কোনো পরিবারকে ফ্ল্যাট ভাড়া দেন না।

এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মু. মোরাদুল ইসলাম বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তারা ওই ভবনে সব সময় থাকেন না, কালেভদ্রে আসেন বলে জানা গেছে। ভূগর্ভস্থ তলাসহ পাঁচটি তলায় পাঁচটি ইউনিট ও প্রতিটি ইউনিটে চারটি করে ঘর ছিল। দুটি ইউনিটে দুটি পরিবার ভাড়া ছিল। আর ভবনটির নিচতলায় দোকানপাট ভাড়া দেওয়া ছিল। সেখানে অনেকেই মারা গেছেন। তবে ওপর থেকে কোনো লাশ উদ্ধার হয়নি। সে থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ভবনটিতে যারা থাকতেন, তারা বেচে আছেন।