ধ্বংস নয়, অগ্রগতির দিকে যেতে চাই: প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা ধ্বংসের দিকে যেত চাই না, আমরা অগ্রগতির দিকে যেতে চাই। শুক্রবার (৭ ডিসেম্বর) বিকেলে গণভবনে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে তিনি একথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা চাই নির্বাচন নিরপেক্ষ ও অবাধ হবে। জনগণের জন্য কাজ করেছি, জনগণ খুশি হয়ে ভোট দিলে আছি, না দিলে নাই। আজকে দেশের মানুষ বুঝতে পারে তাদের জন্য কারা কাজ করেছে।’
এসময় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে জনগণসহ দেশের সামরিক-বেসমারিক সব ক্ষেত্রে অন্যায় অবিচারের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। আমেরিকা ও ভারতের নাম উল্লেখ করে গ্যাস বিক্রিতে রাজি না হওয়ার সরকার গঠনে ব্যর্থ হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি বললাম, আমরা এতো গ্যাস নাই। আমি দিতে পারবো না। স্বাভাবিকভাবে দুইটা দেশেই একটু বিগড়ে গেল। আর নির্বাচনটাও হলো সেভাবে। তখনকার অনেকেই একেবারে হাতে তুলে হারালো। আমরা কিন্তু ভোটে হারিনি। ভোট কিন্তু আমরা বেশি পেয়েছিলাম এতো বাধার পরও। কিন্তু গোনা সিটে হেরে গেলাম, সেখানে আমাদের কম দেওয়া হলো। পরবর্তীতে আমি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটা ডকুমেন্ট পেয়েছিলাম, যেখানে তখনই মার্ক করা ছিল কোন কোন সিট আমাদের দেওয়া হবে আর কোনটা দেওয়া হবে না। কোনটা লাল কালি দেওয়া, কোনটা হলুদ কালি দেওয়া কোনটা সবুজ কালি দেওয়া কোনটা নীল দেওয়া। সেটা থেকেই বুঝা নির্বাচনটা তখন কেমন হয়েছিল? আমরা চাই নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে। অনেক অপমান, অনেক কিছু সহ্য করার পরও যখন অন্যান্য দলগুলো চাইলো, আমার সঙ্গে সংলাপ করবে আমি কিন্তু সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলাম। দিনের পর দিন সকলের সাথে আলোচনা করেছি। কারণ আমার একটিই কথা ছিল, সকলে মিলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন, নির্বাচনটা অবাধ নিরপেক্ষ হবে। সেখানে আমাদের এই নিয়ত নাই যে, ভোট নিয়ে নিয়ে জিতবো। জনগণের জন্য কাজ করেছি, জনগণ যদি খুশি হয়ে ভোট দেয়, আছি ক্ষমতায় না দিলে নাই। কিন্তু দেশের ভাগ্যটা পরিবর্তন করা এটাই আমাদের লক্ষ্য।’
বিএনপি-জামায়াতের আগুন সন্ত্রাসেরও সমালোচনা করেন শেখ হাসিনা তিনি বলেন, ‘আজকে দেশের মানুষ বুঝতে পারে, দেশের মানুষ জানে সেটা। তারপরও যত কাজই করি না কেন, আসলে শুধু কাজ করলেই মানুষ ভোট দেবে তা কিন্ত না। মানুষকে কিন্তু স্মরণ করিয়ে দিতে হয়। মানুষকে বলতে হয়। এই সরকার আপনাদের জন্য এই কাজ করেছে। কাজেই আগামীতে আরও করবে-এই কথাগুলো পৌঁছে দিতে হবে। পৌঁছে না দিলে কিন্তু ভুলে যায়।’
ক্ষমতায় থাকাকালে চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে হেরে যাওয়ার উদহারণ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ওই সময়ে যত উন্নতি হয়েছে। শহরগুলো সুন্দরভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল। কিন্তু তারপরও দেখা গেল নির্বাচনে আমরা ভোট পেলাম না। তখন আমি প্রার্থীদের বলেছিলাম, শুধু উন্নতি করলে হয় না বারবার জনগণকে বলতে হবে, আপনার জন্য এটা করেছি, তাহলেই তারা বুঝবে। কারণ মানুষ সুখের দিনে দুঃখটা ভুলে যায়, সুখটা তারা ইনজয় করতে থাকে। কাজেই মনে করিয়ে দিতে হবে বারবার। বলতে হবে। আগামীতে নির্বাচন। আপনারা আজকে সবাই উপস্থিত হয়েছেন এবং আমাদের সমর্থন দিয়েছেন। একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। আর সেই বিভীষিকাময় অবস্থায় দেশ যাক, সেটা আমরা চাই না। আবার অগ্নিসন্ত্রাস, বাংলা ভাই, জঙ্গিবাদ, মানিলন্ডারিং, দুর্নীতি মাদক অস্ত্র, সস্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এটা আর বাংলাদেশের মানুষ চায় না।’
সরকারের ধারাবাহিকতায় সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের দিকগুলো তুলে শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০০৮ সালের নির্বাচনে ইশতেহার দিয়েছিলাম দিন বদলের সনদ। ওটার মূল কথাগুলি প্রস্তুত করেছিলাম ২০০৭ সালে যখন গ্রেফতার সাবজেলে বন্দি ছিলাম। সেখানে বসেই লিখেছিলাম আমরা কত সালের মধ্যে কি কি করবো। আজকে অন্তত এইটুকু দাবি করতে পারি, দিন বদলের সনদটা কার্যকর হয়ে প্রকৃতপক্ষে মানুষের জীবন বদলে গেছে। এখন মানুষ অনেক উন্নত সুন্দর জীবন পাচ্ছে। কিন্তু আরও আমাদের করতে হবে। কারণ দারিদ্র্য হার তো কেবল ২১ ভাগে নামিয়েছি যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা ৫ ভাগে না নামাবো, ১৬/ ১৭’তে না নামাবো ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের কাজ করতে হবে।’
দেশের উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ ও কর্মসূচিগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ করছি। সেগুলোকে তো আমাদের বাস্তবায়ন করতে হবে। নইলে আবার হয়ত সব ধ্বংস হয়ে যাবে। এখন আমরা যেমন খাদ্য উৎপাদনে একটা অবস্থান করে নিয়েছি, এই জায়গাগুলো আবার শেষ হয়ে যাবে। কারণ আমরা আওয়ামী লীগ আমরা কিন্তু নিজেরা ব্যবসা করতে আসিনি। আমরা মানুষের কল্যাণ করবার জন্য এসেছি। কিন্তু অনেকে তো ক্ষমতাকে মনে কওে তার ব্যবসার একটা বড় সুযোগ।’
২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘ ঘোষণা দিয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে সাসটেইনবেল ডেভলপমেন্ট অর্জন করতে হবে। আমরা ঘোষণা দিয়েছি ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে আমরা উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসাবে গড়ে তুলবো দক্ষিণ এশিয়ায়। সেই সাথে ২০৭১ সালে স্বাধীনতার শতবার্ষিকী পালন করবো। তখন হয়ত বেঁচে থাকবো না। কিন্তু তারপরও আমরা এই পরিকল্পনাগুলো দিয়ে রেখে যেতে চাই। আর সেই সাথে ২১০০ সালের জন্য ডেলটা প্ল্যান ইতোমধ্যেই প্রণয়ন করেছি। ২১০০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ কেমন হবে সেই পরিকল্পনাও আমাদের দেওয়া। কাজইে আমরা যদি ক্ষমতায় আসতে না পারি এই চলমান কাজগুলো তো সম্পন্ন হবে না, করবে না। করবে না এই কারণে যারা স্বাধীনতাই বিশ্বাস করে না। যারা বাংলাদেশ এগিয়ে যাক চায় না। বাংলাদেশের মানুষ ভাল থাক সেটা চায় না। তারা করবে কেন কিন্তু আমরা তো বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে চাই। আর করতে চাই বলেই সরকারের ধারাবাহিকতাটা প্রয়োজন।’
সাবেক সরকারি আমলাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা এসেছেন, আমি খুব আনন্দিত। আসলে আপনাদের কথার গুরুত্ব আছে। আপনারা যে যে অঞ্চলে যে এলাকায় বাড়ি সেখানকার মানুষ কিন্তু আপনাদের একটা অন্য সম্মানের চোখে দেখে। কাজেই সেইদিক থেকে আপনারা যদি একটা কথা বলেন। তারা কিন্তু সেটা গ্রহণ করবে এবং মেনে নেবে। আর মানুষকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিতে হয়। আমাদের স্মৃতিশক্তি তো খুব কম। বাংলাদেশে ছয় ঋতু। দুই মাস পর পর ঋতু পরিবর্তন হয়। দুই মাসের বেশি আমরা ভাল কথা মনে রাখি না। এটা হলো বাস্তবতা। এজন্যই মানুষকে এটা বারবার মনে করে দেওয়া উচিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেকের খুব করুণ কাহিনী শুনলাম। কাজেই সেগুলো আপনারা লিখতে পারেন। মানুষের জানা উচিত কিভাবে অত্যাচার হয়েছে। আর সেই সঙ্গে সঙ্গে বলবো, আমাদের উন্নয়নের কথাগুলি মানুষের কাছে তুলে ধরা আর সেই সাথে মানুষের কাছে একটা ভোট চাওয়া। যখন মনে পড়বে আসবেন। আর আপনাদের সবার ফোন নম্বর আমরা নিয়ে নেবো। আমি আমাদের অনেক নেতাদের এবার ইলেকশন করতে না দিয়ে ইলেকশন পরিচালনার জন্য এবং সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার জন্য রেখেছি। তারা যোগাযোগ রাখবে। এক একটা এক একটা গ্রুপের দায়িত্ব আমরা দিয়ে দিচ্ছি। কাজেই তারা এই বিষয়টা দেখবে। ইনশাল্লাহ বাংলাদেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। আমরা চাই না একটা খুনির দল যুদ্ধাপরাধীর দল আর স্বাধীনতা বিরোধী, অগ্নিসন্ত্রাস যারা করে এরা আর এদেশে ক্ষমতায় আসুক। সেটা আমরা কেউই চাই না। কারণ তারা দেশটাকে ধ্বংস করে দেবে। আমরা ধ্বংসের দিকে যেতে চাই না। আমরা অগ্রগতির দিকে যেতে চাই। এই অগ্রগতির পথে আমরা এগিয়ে যাবো।’
এর আগে গণভবনে তিন শতাধিক সাবেক আমলা, কূটনীতিক, প্রকৌশলী আগামী নির্বাচনে নৌকার পক্ষে কাজ করতে একাত্মতা প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে একাত্মতা প্রকাশ করে তারা নৌকার বিজয়ে দলের পক্ষে কাজ করার অঙ্গীকার করেছেন।
সাবেক সরকারি আমলাদের মধ্যে সিনিয়র সচিব ৬৫ জন, সাবেক রাষ্ট্রদূত ৯ জন, যুগ্ম/উপ সচিব পর্যায়ে ৭৫ জন, স্বাস্থ্য ক্যাডারের ১৪ জন, শিক্ষা ক্যাডারের ১৫ জন, প্রকৌশলী ২৭ জন, বন ও ডাক বিভাগের ১১ জন, পুলিশ ক্যাডারের ১৪ জন, কর ১৩ জন, কৃষি ৬৭ জন, টেলিকম, শুল্ক, রেলওয়ে, খাদ্যসহ অন্যান্য কাডারে ১১ জন।


