রাজধানীতে রেললাইনের বাজার সরানো যাচ্ছেই না!
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে রেললাইনের দু-পাশের জমি দখল করে গড়ে উঠা কাঁচাবাজারসহ অবৈধ স্থাপনা সরানো যাচ্ছেই না। জুরাইন, খিলগাঁও, কাওরানবাজারের কয়েকটি স্থানে রেললাইনের স্লিপারের ওপরই বসে কাঁচাবাজার। জনসচেতনতার অভাবে মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন চলে বেচাকেনা। খোদ রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক বলছেন, উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও কয়েক দিনের মধ্যে আবার দখল হয়ে যায়।
রেলওয়ে পুলিশের হিসাব মতে, গেল বছর রেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৩৪৭ জন। দুর্ঘটনার বেশিভাগই ঘটেছে রেললাইনের ওপর দিয়ে অবৈধভাবে যাতায়াত এবং অসাবধানতার কারণে। জুরাইনে রেললাইনের দু-পাশ দখল করে, এমনকি স্লিপারের ওপর পর্যন্ত বসছে কাঁচাবাজার। ট্রেন এলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পণ্যসামগ্রী সরিয়ে নেন দোকান মালিকরা। সেই সঙ্গে ছোটাছুটি শুরু হয় ক্রেতাদের। এমন দৃশ্য প্রতি ঘণ্টায় একবার করে দেখা যায় এই রেলক্রসিং এলাকায়।
তবে শুধু জুরাইনই নয়, খিলগাঁও, কাওরানবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে রেলের জমি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে কাঁচাবাজারসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এসব স্থানেই ঘটে বেশিরভাগ দুর্ঘটনা। নিয়ম অনুসারে রেললাইনের দু-পাশের ১০ ফুট জায়গায় কোনো স্থাপনা রাখা যাবে না। কিন্তু নিয়মের তোয়াক্কা না করেই দখল হচ্ছে রেলের জায়গা।
প্রায় প্রতিদিন কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। এরপরও বিপজ্জনক এ বাজারগুলো চলছেই, মাঝে মধ্যে অবৈধ এসব বাজার উচ্ছেদ অভিযান চলে। সকালে উচ্ছেদ করা হলে বিকালেই ফের বসে বাজার। বিকালে উচ্ছেদ হলে রাতেই তা আবার জমজমাট।
ক্রেতা আলমগীর হোসেন প্রতিদিন খিলগাঁও রেলগেট থেকে নিয়মিত বাজার করে থাকেন, তার বাসা তিলপাপাড়া। প্রতিদিন অফিস শেষে বাসায় ফেরার পথে এখান থেকে বাজার করে বাসায় ফেরেন, তার মতে রেললাইনের ওপর বাজার অবৈধ জানি কিন্তু এখানে অনেক টাটকা শাকসবজি পাওয়া যায় তাই এখানে বাজার করেন। ঝুঁকির কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঝুঁকি তো রয়েছেই যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে দুর্ঘটনা তারপরও তো থেমে থাকছে না বেচাকেনা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অবৈধ এসব বাজার থেকে মাসে কয়েক কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। রেলওয়ে, থানা পুলিশ এবং রেলওয়ের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা নিয়ন্ত্রণ করছে বিপজ্জনক বাজারগুলো। যে কারণে বারবার দুর্ঘটনা ঘটলেও অবৈধ স্থাপনা ও বাজার উচ্ছেদে খুব একটা জোরালো পদক্ষেপ নেন না সংশ্লিষ্টরা। প্রায় প্রতিটি ঘটনাই ঘটে বাজার ও লেভেল ক্রসিংয়ের সামনে।
জানা গেছে, টঙ্গী, উত্তরখান, কসাইবাড়ী, খিলক্ষেত, কুড়িল বিশ্বরোড, মহাখালী, নাখালপাড়া, তেজকুনিপাড়া, তেজগাঁও, কারওয়ানবাজার, মগবাজার, গোপীবাগ, টিটিপাড়া, জুরাইনসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় গড়ে ওঠা অর্ধশতাধিক বাজার বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। এমন কয়েকটি বাজার রয়েছে যেখানে ৫০ গজ দূরে ট্রেন থাকলেও দেখা সম্ভব হয় না। সরেজমিনে দেখা যায়, কারওয়ানবাজার রেললাইন ঘেঁষে গড়ে ওঠা বাজার যেন একটি মৃত্যুফাঁদ। রেললাইনের ওপর মাছের বাজার আর পাশের জায়গা দখল করে দোকান গড়ে তোলার কারণেই বারবার ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে সেখানে। প্রতিদিন ভোর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত পুরো রেললাইনের ওপর বিরাট এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা মাছের আড়তে কয়েক হাজার মানুষের সমাগম থাকে।
খিলগাঁও রেলক্রসিং হচ্ছে কমলাপুর স্টেশন থেকে প্রতিটি রেলের অভিমুখ এবং আন্তঃমুখ পয়েন্ট। অথচ এ ক্রসিংমুখের চারপাশেই গড়ে উঠেছে ঝুপড়ি টানিয়ে শাকসবজি ও মাছ-মাংসের বাজার। এমনকি দুই রেলপথের মাঝখানে খাঁচি, টুপরি, ঝাঁকা পেতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিক্রি চলছেই। সকালে উচ্ছেদ অভিযান চললেও বিকালেই সেখানে বাজার আবার জমজমাট হয়ে ওঠে। বিমানবন্দর রেলক্রসিংয়ের ওপরই নিয়মিত বসছে বাজার। ফলমূল, মাছ, সবজিসহ নানা পসরা নিয়ে বসেন বিক্রেতারা। খিলক্ষেত রেলক্রসিংয়ের ওপর দিনভর বসে কাঁচাবাজার। ভয়াবহ অবস্থা জুরাইনে। ক্রেতারাও রেললাইনের ওপর দাঁড়িয়ে বাজার সারছেন। রেললাইনের দু-তিন ফুট দূরেই বিভিন্ন সামগ্রীর দোকান।
মগবাজার রেললাইনের ওপর কাঁচাবাজারে সকাল থেকেই মানুষ ব্যস্ত থাকে কেনাকাটায়। তবে বিপত্তি ঘটে তখনই যখন দ্রুত গতিতে আসা ট্রেন লাইনের ওপর দিয়ে ছুটে যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকটা বাধ্য হয়েই ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় ব্যবসা করছেন। ক্রেতারাও স্বীকার করেছেন এ ঝুঁকির কথা তবে হাতের কাছেই প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাওয়ায় তারা এখানেই কেনাকাটা করেন।


