শ্রমিকরা কবে পাবে ন্যায্য অধিকার
রাজধানীর ঝিগাতলার একটি দোকানে কাজ করেন খালিদসহ ৭ শ্রমিক। দিনে ১২ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে হয় তাদের। সাপ্তাহিক, এমনকি মাসিক ছুটি বলতেও কিছু ঠিক করা নেই তাদের। কয়েক দিন ধরেই ১ মে ছুটির জন্য মালিকের কাছে ধরনা দিচ্ছেন সোহেলরা; কিন্তু মালিকের তাতে সায় নেই। বিশ্ব যখন শ্রমিক অধিকার দিবস বা মে দিবস উপলক্ষে ছুটি ভোগ করবে, তখন তারা ব্যস্ত রয়েছেন কাজে; বাড়তি মজুরিও পাবেন না।
শুধু এ ৭ জনই নয়, দেশের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের সোয়া ৫ কোটি শ্রমিক আছেন অনিশ্চয়তায়। তারা রয়েছেন শ্রম আইনের বাইরে। তাদের নেই কোনো নিয়োগপত্র বা চাকরির নিরাপত্তা; এমনকি সর্বনিম্ন কোনো মজুরিও ঠিক করা নেই তাদের। মালিক যা দেন তাতেই চলতে হয়, না হলে অন্যত্র চাকরি খোঁজার ভয়। যদিও এ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরাই অর্থনীতির মূল শক্তি। এ অবস্থায় আজ বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে মহান মে দিবস।
জানতে চাইলে সেন্টার পর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক খাতেই শ্রমিকদের ন্যূনতম যেসব সুবিধা দেওয়ার কথা, তা নিশ্চিত করা হয়নি। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে তো কথাই নেই। উৎপাদন সংশ্লিষ্ট ১৩৯ খাতের মধ্যে মাত্র ৪৩টি ন্যূনতম মজুরির আওতায় এসেছে। এছাড়া শ্রমিকের আইডি কার্ড, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, সাপ্তাহিক ছুটি, কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, বিনোদন, সংগঠন করার অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে এখনও প্রাতিষ্ঠানিক খাত অনেক পিছিয়ে আছে। আর অপ্রাতিষ্ঠানিক অনেক খাতে এখনও এসব সুবিধার কথা আলোচনায়ই আসেনি। অবশ্যই এসব বিষয় নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক, বিশেষ করে রপ্তানিমুখী খাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অধিকারের বিষয়গুলো গুরুত্ব দেওয়া হলেও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে; যেন অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাজ করতে না হয়।
তিনি বলেন, তার (শ্রমিকের) যেন নিয়োগপত্র থাকে, নির্দিষ্ট মজুরি থাকে, সমস্যায় পড়লে কাউকে বলতে পারে, শ্রম আইন অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা পেতে পারে। শ্রমিকরা যেসব স্বাভাবিক ছুটি এবং অন্যান্য ছুটিও পেতে পারে, সে ব্যবস্থাও করতে হবে ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শ্রমশক্তি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তারা যে কোনো সময় কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়বে তার পুরো পরিবারের ওপর। সে কোনো ক্ষতিপূরণও পাবে না। ফলে তাদের জীবনযাত্রার মান কমে দারিদ্র্যসীমায় নেমে যেতে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ (২০১৬-১৭) বলছে, দেশে ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে শ্রমে নিয়োজিত রয়েছেন ৬ কোটি ৮ লাখ মানুষ। এর মধ্যে অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত আছেন ৫ কোটি ১৭ লাখ ৩৪ হাজার জন। অর্থাৎ মোট শ্রমশক্তির ৮৫ দশমিক ০১ ভাগই অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক। এর মধ্যে নারী শ্রমিক ১ কোটি ৭১ লাখ ২১ হাজার, আর পুরুষ ৩ কোটি ৪৬ লাখ ১৩ হাজার। কৃষিতে ৯৫ দশমিক ৪ শতাংশ, শিল্পে ৮৯ দশমিক ৯ শতাংশ এবং সেবায় ৭১ দশমিক ৮ শতাংশ শ্রমশক্তি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শ্রমের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের মধ্যে রয়েছে কৃষি, পরিবহন, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, নির্মাণ, পাথর উত্তোলন, মৎস্য ইত্যাদি।
শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) বলছে, প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক সব খাতের শ্রমিকরাই রয়েছেন নানা ঝুঁকিতে। বিলসের শ্রম পরিস্থিতি-২০১৭ প্রতিবেদনের তথ্য মতে, ২০১৭ সালে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭৮৪ শ্রমিক, তার মধ্যে ২১ জন নারী। এর মধ্যে খাত অনুযায়ী পরিবহন খাতে নিহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ৩০৭ জন।
এছাড়া নির্মাণ খাতে ১৩১ জন, দিনমজুর ৫৫ জন, কৃষিতে ৩৪ জন, ইলেকট্রিশিয়ান ২৪ জন, জাহাজ ভাঙায় ২১ জন, পাথর উত্তোলনে ২১ জন, চালকলে ২০ জন, মৎস্য শ্রমিক ১৭ জন এবং গার্মেন্ট শিল্পে ১৬ শ্রমিক নিহত হন। আহতের সংখ্যাও কম নয়। গত বছর কর্মক্ষেত্রে আহত হয়েছেন ৫১৭ শ্রমিক, যার মধ্যে ১০৯ জন নারী। বিলসের তথ্যানুযায়ী, গত পাঁচ বছরে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় মোট ৪ হাজার ১৫৫ শ্রমিক নিহত এবং ৭ হাজার ১১২ জন আহত হয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর ১৮১টি শিল্প বিরোধের ঘটনা ঘটে; যেখানে তৈরি পোশাক শিল্পে ৯১টি, পরিবহন ক্ষেত্রে ৩৬টি, বিড়ি শিল্পে ৭টি, কৃষি খাতে ৬টি এবং চিনি শিল্প এবং নৌপরিবহন খাতের প্রতিটিতে ৫টি করে বিরোধের ঘটনা ঘটে। শিল্প বিরোধের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে বকেয়া মজুরি, ওভারটাইম, ক্ষতিপূরণ, বিনা নোটিশে কর্মী ছাঁটাই ইত্যাদি। এসব কারণে ৬৮টি বিক্ষোভ ও ২১টি মানববন্ধন হয়েছে। এছাড়া ধর্মঘট ১৮টি, সড়ক অবরোধ ১৫টি এবং সমাবেশ হয়েছে ১২টি।


