English Version
আপডেট : ৩১ মার্চ, ২০১৮ ১৬:২১

ডিএনসিসির হটলাইন : অভিযোগ যায় কাজ হয় না

অনলাইন ডেস্ক
ডিএনসিসির হটলাইন : অভিযোগ যায় কাজ হয় না

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) হটলাইনে গত ২৫ মার্চ কল করেন ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ইদ্রিস হাসান মাসুম। হোল্ডিং নম্বর ১২৮, কুড়িল কাজী বাড়ি মসজিদ সংলগ্ন এলাকার পরিচয় দিয়ে তিনি বলেন, ‘মশার জ্বালায় অতিষ্ঠ এলাকার মানুষ। মশার কয়েল লাগিয়ে, ওষুধ স্প্রে করেও মশার যন্ত্রণায় থাকা যাচ্ছে না। মশারি টানিয়ে মুক্তি পাচ্ছি না। রাতে তো আছেই দিনের বেলায় কোথাও নীরবে বসা যাচ্ছে না। এই এলাকায় অনেক দিন থেকে মশার ওষুধ ছিটাতে দেখি না মশক নিধন কর্মীদের।’

ডিএনসিসির হটলাইনে এমন অভিযোগ শোনার পর কর্মকর্তারা বলেছেন, ‘কালকের মধ্যে (২৬ মার্চ) মশক নিধনকর্মীরা যাবে।’ অথচ অভিযোগের ছয় দিন পার হলেও দেখা যায়নি কোন কর্মীকে। দিনকে দিন বাড়ছে মশার উৎপাত। এখন এই এলাকায় বসবাস করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তার মতো আরেক ভুক্তভোগী নাদিফা তাবাসসুম ফেমা। সে সিদ্ধেশ্বরী গালর্স স্কুলের ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী। নাদিফা তাবাসসুম ২২ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন মহানগর প্রজেক্ট ১ নম্বর রোডের বাসিন্দা। ফেমা গত ১৮ মার্চ প্রতিদিনের সংবাদ অফিসে এসে মশার অতিষ্ঠের কথা প্রতিবেদকের কাছে জানান। প্রতিবেদক ডিএনসিসির হটলাইনের নম্বর দিয়ে অভিযোগ করতে বলেন। পরদিন কল করে অভিযোগ জানানো হয়। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সমাধানের আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত মশক নিধনের কোনো কর্মীর দেখা মেলেনি।

অভিযোগ করে ফেমা বলে, ‘গত এক বছরেও এই এলাকায় মশার ওষুধ ছিটাতে দেখিনি কাউকে। বছরের অন্যান্য সময় মশার দাপট কিছুটা কম থাকলেও গত দুই মাসে অতিষ্ঠ হয়ে গেছি। সামনে পরীক্ষা, পড়ার টেবিল বসতে পারি না।’ নগরবাসীর অভিযোগ, মশার কামড়ে অতিষ্ঠ নগরবাসী। এ মৌসুমে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে দক্ষিণের তুলনায় উত্তর সিটিতে মশার প্রকোপ ভয়াবহ। স্কুল, হাসপাতাল, অফিস থেকে শুরু করে বিমানের ভেতরে পর্যন্ত মশার আক্রমণ। উত্তর সিটির বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেলায়ও মশারি টাঙিয়ে রাখতে হয়। নর্দমা, ড্রেন ও খালের নোংরা পানিতে জন্ম নেওয়া মশা নিধনে দুই সিটি করপোরেশন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। উপরন্তু, বিভিন্ন সময়ে মশা নিয়ে নগরবাসীর সঙ্গে ‘মশকরা’ করতে দেখা গেছে সংশ্লিষ্টদের।

দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে আয়তনে বড় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। উত্তর সিটিতে মশার প্রকোপ বেশি হলেও এ খাতে সংস্থাটির বরাদ্দ দক্ষিণের চেয়ে কম। ডিএনসিসির গুলশান-বনানী ও বারিধারা এলাকার বাসিন্দাদের অনেকেই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় মশা নিধন করে থাকেন। এরপরও মশার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না এলাকার বাসিন্দারা। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কয়েল ও মশারি টানিয়ে নগরবাসী মশা মোকাবিলা করলেও এডিস মশা নিয়ে ইতোমধ্যেই আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় মশার বিষয়ে তথ্য জানাতে হটলাইন চালু করছে ডিএনসিসি। এই উদ্যোগকে মশকরা হিসেবেই দেখছেন নগরবাসী।

মশার দাপটে অতিষ্ঠ নাগরিকরা বলেছেন, মশার বিষয়টি এমন নয় যে, এটা নির্ধারিত কোনো বাড়ি বা এলাকাভিত্তিক সমস্যা। রাজধানী জুড়েই মশার উপদ্রব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এ অবস্থায় সিটি করপোরেশনের উচিত হবে বিশেষ প্রোগ্রাম হাতে নিয়ে একযোগে মশা নিধন শুরু করা। কিন্তু তা না করে হটলাইন চালুর সিদ্ধান্তটি সঠিক নয়। এর অর্থ হচ্ছে, যেখান থেকে ফোন আসবে, কেবল সেখানেই ওষুধ ছিটানো হবে। আর যারা ফোন করতে পারবে না, তারা এ সেবা পাবে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএনসিসির কয়েকজন মশক সুপারভাইজার বলেন, ‘কেউ ফোন করলে তার বাড়িতে গিয়ে স্প্রে করলে মশা নিধন হবে না। হয়ত তাৎক্ষণিক একটা সুফল আসবে। কিন্তু যদি আশপাশের বিশাল এলাকাজুড়ে স্প্রে করা না হয়, তাহলে এক-দুই ঘণ্টা পর পাশের ভবন থেকে ওই বাড়িতে আবার মশা চলে আসবে। ফলে হটলাইন কোনো কাজে আসবে না। বরং আমাদের উচিত হবে একদিনে দুই-তিনটি ওয়ার্ড করে একযোগে ফগিং করা। তাহলে মশা থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দেওয়া যাবে।’

ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে যাওয়ায় ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি হটলাইন চালু করেছে উত্তর সিটি করপোরেশন। ডিএনসিসিভুক্ত যেকোনো এলাকায় মশার উপদ্রবের খবর জানানো যাবে ০১৯৩২৬৬৫৫৪৪ নম্বর হটলাইনে। কোনো এলাকা বা বাড়িতে মশার উপদ্রব দেখা দিলে এই হটলাইনের মাধ্যমে ডিএনসিসিকে খবর জানানো যাবে। পরে ডিএনসিসির কর্মীরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ওই বাড়ি বা এলাকায় ওষুধ ছিটিয়ে আসবে। তাদের এ আহ্বানে ওই দিন সকাল থেকেই ফোন করতে শুরু করেন নগরবাসী।

জানা গেছে, ডিএনসিসির হটলাইনটিতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ফোন করেন ৬৫ জন, এর মধ্যে ডিএনসিসি এলাকার ৬২ জন। ১ মার্চ ফোন আসে ১৩৯টি, এর মধ্যে ডিএনসিসি এলাকার ১২৫ জন। ২ মার্চ ডিএনসিসি এলাকার ৬৪টি, ৩ মার্চ ৯০টি, ৪ মার্চ ৭৩টি, ৫ মার্চ ৬৬টি, ৬ মার্চ ৬৯টি, ৭ মার্চ ৪২টি, ৮ মার্চ ২৭টি, ৯ মার্চ ১৯টি, ১০ মার্চ ১৮টি, ১১ মার্চ ১৫টি, ১২ মার্চ ১১টি, ১৩ মার্চ ১৫টি, ১৪ মার্চ ১৮টি, ১৫ মার্চ ১১টি, ১৮ মার্চ ১৩টি কল আসে।

এ বিষয়ে ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাকির হাসান বলেন, ‘নাগরিকের স্বার্থে হটলাইন চালু করা হয়েছে, কিন্তু নাগরিকদের অতিরিক্ত আবদারের কারণে সেটা সম্ভব হয়ে ওঠে না। যেমন নাগরিকরা কল করে অভিযোগ জানান। পরে মশক নিধন কর্মীরা ওষুধ ছিটাতে গেলে বাসার ভেতর স্প্রে করতে বলে। কিন্তু সিটি করপোরেশনের নিয়ম অনুযায়ী, বাড়ির ভেতর ওষুধ স্প্রে করার কোনো নিয়ম নেই। আর বাড়ির ভেতর ওষুধ স্প্রে করতে গেলে টাকা আদান-প্রদান করার অভিযোগ আসে। সে জন্য আপাতত বাড়ির ভেতর ওষুধ স্প্রে করার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘মশা নিধন কার্যক্রমে শুধু সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা নন, এর সঙ্গে ওয়ার্ড কাউন্সিলররা জড়িত। প্রত্যেক ওয়ার্ডের বাসিন্দারা যদি কাউন্সিলরের কাছে অভিযোগ জানান, তাহলে মশা উৎপাতের দ্রুত সমাধান করা সম্ভব।’

উল্লেখ্য, গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত মশা নিধনে বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম চালু করা হয়। এর আগে ২০১৭ সালের ১৮ জুলাই থেকে ১ আগস্ট, ২১ অক্টোবর থেকে ৩১ অক্টোবর, ২১ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর এবং ২৪ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম চালিয়েছে সংস্থাটি।