English Version
আপডেট : ৮ মার্চ, ২০১৮ ১৭:৩৯

স্মার্টকার্ড প্রকল্প ফের ঝুঁকিতে

অনলাইন ডেস্ক
স্মার্টকার্ড প্রকল্প ফের ঝুঁকিতে

ফের ঝুঁকিতে পড়ল আধুনিক প্রযুক্তির তথ্য-সংবলিত স্মার্টকার্ড প্রকল্প। সরবরাহকারী সংস্থা ‘বাংলাফোন’ বিনা নোটিসে ডাটা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এতে রীতিমতো বিস্মিত স্মার্টকার্ড প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, চুক্তি নিয়ে (ডাটা সংযোগ সচল রাখা) বিরোধ ইস্যুতে গত ৫ মার্চ মধ্যরাতের পর প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভাণ্ডারে স্মার্টকার্ড মুদ্রণের জন্য স্থাপিত পারসু সেন্টারের ডাটা সংযোগ বন্ধ করে দেয় বাংলাফোন। গতকাল বুধবার পর্যন্ত সমঝোতা না হওয়ায় চালু হয়নি সেন্টারটি। আর্থিক ও মুদ্রণে বিঘ্ন ঘটানোর জন্য বাংলাফোন কোম্পানিকে দায়ী করেছেন আইডেন্টিফিকেশন অব এনহ্যান্স একসেস টু সার্ভিস (আইডিয়া) প্রকল্প। তবে, ডাটা সরবরাহকারী সংস্থা কর্তৃপক্ষের ওই অভিযোগ নাকচ করে বলেছে, চুক্তি অনুযায়ী কাজ না করায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।

তথ্যমতে, আগারগাঁওয়ের ইসলামিক ফাউন্ডেশনে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য ভাণ্ডারের সঙ্গে এই সেন্টারের সংযোগ রয়েছে। এখন ‘বাংলাফোন’ এর বিকল্প হিসেবে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিটিসিএলের সঙ্গে নতুন করে ডাটা সংযোগ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে চুক্তি করা হচ্ছে। গত মঙ্গলবার দিনভর স্মার্টকার্ডের সঙ্গে সম্পৃক্তরা যোগাযোগ চালিয়ে বিকল্প হিসেবে ওই সংস্থাকে নির্বাচিত করেছে। এখন চলছে তাদের সঙ্গে ডাটা বাবদ মাসিক বিনিময়ের হার নিয়ে সমঝোতা চুক্তি।

আইডিয়া কর্তৃপক্ষ বলছে, শিগগিরই অর্থাৎ দু-একদিনের মধ্যে নতুন উদ্যামে স্মার্টকার্ডের মুদ্রণ শুরু হবে। কারণ একদিন মুদ্রণ বিলম্বিত হলে যথাসময়ে মুদ্রণ শেষ করা নতুন করে ঝুঁকিতে পড়ে যেতে পারে। কারণ দৈনিক মুদ্রণ হচ্ছে প্রায় দেড় লাখ স্মার্টকার্ড।

এর আগে ফ্রান্সের ওবার্থুর ব্যর্থতার দায়ে স্মার্টকার্ড প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছিল। তাদের সঙ্গে চুক্তি শেষ করে এখন নিজস্ব উদ্যোগে চলছে কার্ড মুদ্রণের কাজ। ওবার্থুর কাছ থেকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ আদায়ে মামলা লড়ছে আইডিয়া কর্তৃপক্ষ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২০১৫ সালের ৬ আগস্ট স্মার্টকার্ড মুদ্রণে নিরবচ্ছিন্ন ডাটা সরবরাহ করার জন্য আইডিয়া প্রকল্পের সঙ্গে চুক্তি হয় বাংলাফোন কোম্পানির। চুক্তির শর্ত ছিল, -প্রতিষ্ঠানটি থেকে ১জিবিপি (প্রতি সেকেন্ডে ১জিবি) ডাটা সরবরাহ মিলবে। এই বাবদ মাসিক টাকা পরিশোধ করতে হয় ৫৭ হাজার টাকা। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয় গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর। পরে চুক্তির মেয়াদ নিয়মিত রাখতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন ডাটা সরবরাহের জন্য সংস্থা দুটির মধ্যে সমঝোতা হয়। এর মধ্যেই নবায়ন নিয়ে বাংলাফোনের সঙ্গে নতুন করে টানাপোড়ন শুরু হয়।

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে ডাটা সংযোগ সংস্থার কাছ থেকে বৈধ ইন্টারনেট প্রোভাইডার সার্ভিস (আইএসপি) লাইসেন্সের হালনাগাদ তথ্য চায় আইডিয়া কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তারা তথ্য সরবরাহে গড়িমসি শুরু করে। পরে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বিটিআরসি) শরণাপন্ন হয়ে গত ২৯ জানুয়ারি সংস্থার ডিজি বরাবর পত্র দেয়; কিন্তু বাংলাফোনের মতো তারাও ইসিকে উপেক্ষা করে চিঠির জবাব দেয়নি। পরে ইসি কর্তৃপক্ষ নিজস্ব অনুসন্ধানে জানতে পারে বাংলাফোনের আইএসপি লাইসেন্স নবায়ন করেনি সরকার। এই তথ্যের পর বাংলাফোনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে অসম্মতি জানায় আইডিয়া প্রকল্প; সেই থেকে শুরু বিরোধের। যার চূড়ান্ত পরিণতি ডাটা সংযোগ বন্ধ।

আইডিয়া প্রকল্পের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, স্মার্টকার্ড মুদ্রণের জন্য সরকার চুক্তির মেয়াদ এক বছর অর্থাৎ আগামী ৩১ ডিসেম্বর ’১৮ পর্যন্ত বর্ধিত করেছে। তবে, জুনের পর প্রকল্প নতুন করে নবায়ন করতে হয়। এর আলোকে বাংলাফোনের সঙ্গে জুন পর্যন্ত নবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু তারা অগ্রাহ্য করে আগামী বছরের অর্থাৎ ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয়। অথচ আমাদের প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ৩১ ডিসেম্বর।

জানতে চাইলে বাংলাফোনের এমডি মো. আমজাদ হোসেন খান বলেন, আমাদের আইএসপির লাইসেন্স সরকার নবায়ন করেননি; কিন্তু সংযোগ সচল রাখতে বিধি-নিষেধ নেই। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের নতুন মন্ত্রী যোগদানের পর আইএসপির লাইসেন্স নবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে; আমাদেরটা প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা প্রসঙ্গে বলেন, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমরা চুক্তির প্রস্তাব করেছি। তবে আইডিয়া কর্তৃপক্ষ চায় আগামী জুন পর্যন্ত নবায়ন করতে। এতে আমাদের আপত্তির কারণে ডাটা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছি।

পাশাপাশি বাংলাফোনের এমডি চুক্তি নবায়ন না করার পেছনে আইডিয়া কর্তৃপক্ষের দুরভিসন্ধি রয়েছে উল্লেখ করে বলেন, ডাটা সংযোগ প্রদানে কর্তৃপক্ষ নতুন করে কোটেশন নেয়। আমার কাছে যে তথ্য রয়েছে, তাতে যে প্রতিষ্ঠানটি সাড়ে তিন লাখ টাকা দরপত্র দিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজটি দিতে এ পথ বেছে নিয়েছে। অথচ আমার প্রতিষ্ঠানকে ডাটা সংযোগ বাবদ মাসিক টাকা দেয় মাত্র ৫৭ হাজার টাকা। এখন আপনি বুঝে নিন সংযোগ বিচ্ছিন্নের জন্য দায়ী কে?

মাঝে ওবার্থুর সঙ্গে সর্ম্পক ছেদ করার পর বিশ্বব্যাংকও এই প্রকল্পে অর্থায়ন এবং চুক্তি হালনাগাদ না করার সিদ্ধান্ত নেয়। গত ৩১ ডিসেম্বর’ ১৭ প্রকল্পটির অসম্পূর্ণ কাজ সরকারের অর্থায়নে আরো এক বছর বেড়ে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ হয়েছে। আইডিয়া প্রকল্প কর্তৃপক্ষ এই সময়ের মধ্যে নয় কোটি ভোটারের স্মার্টকার্ড মুদ্রণের পর বিতরণ কাজও শেষ করার চ্যালেঞ্জ নেন বর্তমান এনআইডির ডিজি এবং আইডিয়ার প্রকল্প পরিচালক ব্রি. জে. মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম।

ওবার্থু এবং বিশ্বব্যাংকের পর সরকার এই প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে ডিজি সাইদুল ইসলামের চ্যালেঞ্জটি কাজে আসে। এমনকি আগে ওবার্থু যেখানে দৈনিক ৫০ হাজারের বেশি কার্ড মুদ্রণ করতে পারত, সেখানে নিজ উদ্যোগে দেড় লাখ কার্ড মুদ্রণের নজির তৈরি করে, যা দেখে বিশ্বব্যাংকও বিস্ময় প্রকাশ করেছিল। কিন্তু বাংলাফোনের আকস্মিক সিদ্ধান্তে নতুন করে জটিলতার মধ্যে পড়ল কর্তৃপক্ষ। ফের ঝুঁকিতে পড়ল স্মার্টকার্ড প্রকল্প। এতে সরকারের বাড়তি অর্থ গচ্ছা যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।