ভিআইপিদের আলাদা লেইন নিয়ে সমালোচনার ঝড়
সড়কে ভিআইপিদের জন্য আলাদা লেইন করার প্রস্তাবের সমালোচনা করে প্রস্তাবকারীদের ‘ধিক্কার’ জানিয়েছেন মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল।
গণজাগরণ মঞ্চের পঞ্চম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে সোমবার শাহবাগে এক আলোচনা সভায় তিনি বলেছেন, “আমরা যখন স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি করতে যাচ্ছি, তখন শুনতে হচ্ছে মন্ত্রীরা তাদের জন্য সড়কে আলাদা লেইন চান। মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশে যদি তাদের মনে এমন চিত্র থেকে থাকে, তাহলে তাদেরকে ধিক্কার জানাই।”
অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিসের মত জরুরি সেবার যানবাহন এবং ভিআইপিদের চলাচলের জন্য রাজধানীর রাজপথে আলাদা লেইন করতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে প্রস্তাব পাঠিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
সেখানে বলা হয়েছে, ‘উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে’ জনবহুল গুরুত্বপূর্ণ শহরে সেবাকাজে নিয়োজিত যানবাহনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের চলাচলের জন্য সড়কে পৃথক লেইন রয়েছে। ঢাকা মহানগরীর সড়কে অনুরূপ লেন তৈরি করা হলে সেবা খাতের যানবাহনসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের চলাচল সহজতর হবে।
এর সমালোচনা করে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল বলেন, “এই দেশটিকে একটি বিভাজিত সমাজ এবং দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় আমাদের রাজনৈতিক শক্তি। প্রতিটি ক্ষেত্রে এখন বিভাজনের রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় এ কথাটি আসছে এমন সময়, যখন বঙ্গবন্ধুর নিজের হাতে গড়া দল ক্ষমতায়।”
তিনি অভিযোগ করেন, মন্ত্রীরা ‘মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহার করে’ নিজেদের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন। এখন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস করে ‘জনগণের কণ্ঠরোধের উদ্যোগ’ নেওয়া হচ্ছে।
“এই প্রেক্ষাপটে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগছে, বাংলাদেশ আজ কোন পথে যাচ্ছে? আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়েছিলাম কিছু মানুষের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ে শাস্তির মুখোমুখি করতে নয়, বরং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে। এই ন্যায়বিচারের মধ্যে মানুষের বাকস্বাধীনতার বিষয়টিও রয়েছে।”
মানুষের কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়া হলে একপর্যায়ে তা মানবতাবিরোধী অপরাধের জায়গায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে বলেও হুঁশিয়ার করেন টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল।
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ জানুয়ারি শাহবাগে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এই আলোচনার শিরোনাম ছিল ‘মত প্রকাশে বাধা, সাম্প্রতিক কালাকানুন: কোন পথে বাংলাদেশ?’
সুলতানা কামাল বলেন, বাংলাদেশ মুক্তমনা মানুষের হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অবলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে মনে করে যখন অনেকেই শঙ্কিত হয়ে উঠেছিলেন, ঠিক তখনই গণজাগরণ মঞ্চ একাত্তরের ‘জয় বাংলা’ স্লোগান সাধারণ মানুষের মুখে ফিরিয়ে এনেছিল।
আর যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই বাংলাদেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আবার শুরু হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এই মানবাধিকার কর্মী বলেন, “আজ বাংলাদেশ এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে পিতা তার পুত্র হত্যার বিচার চায় না। ধর্ষণের শিকার নারী ধর্ষণের বিচার চান না। দেশে এখন ন্যায়বিচার তো নাই, বরং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশাও মানুষের মন থেকে চলে যাচ্ছে। আমরা বেঁচে থাকতে বাংলাদেশকে দুর্বৃত্তের হাতে যেতে দেব না।”
গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার বলেন, যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রাথমিক যে দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা অনেকটা পূরণ হয়েছে।
“কিন্তু আমাদের যে মূল দাবি, তা এখনো পূরণ হয়নি। দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আমরা যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে রাজপথে নেমেছিলাম, আমরাই সেই বিচারহীনতার সংস্কৃতির মুখোমুখি হয়েছি। কারণ আমাদের অনেক সহযোদ্ধাকে হত্যা করা হলেও বিচার পাইনি।
“বরং আইন করে আমাদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে হাল্লা রাজার দেশে পরিণত হতে দিতে পারি না এবং দেব না। সেজন্যই গণজাগরণ মঞ্চ লড়ে যাচ্ছে।”
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে শুধু অন্যায়ের প্রতিবাদকারীদেরই কণ্ঠরোধ করা হবে না, গণমাধ্যমকর্মীদেরও মুখ বন্ধ করা হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন ইমরান।
তিনি বলেন, “যেভাবে দেশ চালানোর চেষ্টা হচ্ছে এবং মানুষের কণ্ঠ রোধ করা হচ্ছে, তাতে বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র না বলে একনায়কতান্ত্রিক বা রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ঘোষণা করে দিলে ভালো হয়। কাগজের গণতন্ত্র আমরা চাই না।”
মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশার ‘উল্টা পথে’ যাত্রা ঠেকাতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করার আহ্বান জানান গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক জামশেদ আনোয়ার তপন আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, যে আইন ঘুষখোর, চোর, লুটপাটকারী আর দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করবে, তেমন আইনের বিরুদ্ধে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
অন্যদের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার শম্পা বসু, ছাত্র ইউনিয়নে কেন্দ্রীয় সভাপতি জি এম জিলানী শুভ ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন প্রিন্স আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন।
গণজাগরণ মঞ্চের পাঁচ বছর পূর্তিতে দুপুরে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে ‘রঙ তুলিতে স্বপ্নের বাংলাদেশ’ শিরোনামে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। বিকালে বের হয় বর্ণাঢ্য ‘জাগরণ যাত্রা’। শাহবাগ থেকে শুরু হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ঘুরে আবার শাহবাগে ফিরে শেষ হয় সেই শোভাযাত্রা।


