সংসদীয় আসনের সীমানাবিন্যাস আইন নিয়ে বিপাকে ইসি
জাতীয় সংসদের আসনভিত্তিক সীমানা পুনর্বিন্যাস করার ক্ষেত্রে সমন্বয় তৈরির জন্য নতুন করে সীমানাবিন্যাস আইনে পরিবর্তন আনতে গিয়ে বিপাকে পড়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বিদ্যমান আইনের আলোকে এত দিন জনসংখ্যা এবং প্রশাসনিক অখন্ডতা বজায় রেখে আসনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। পুরনো আইনের সঙ্গে সংশোধিত আইনে উপজেলার অখন্ডতা, ভোটার সংখ্যা এবং আয়তন যোগ করেও আসন ভাগাভাগিতে সমন্বয় আনতে পারছে না এ-সংক্রান্ত সাব-কমিটি।
কমিটির মতে, আইনে পরিবর্তন এনে সীমানাবিন্যাস করা হলেও অতীতের মতো গ্রামের আসন আরো কমবে। তাই আইনটিকে আরো যুগোপযোগী করতে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, উপজেলা ও আসনওয়ারী ভোটার সংখ্যার তথ্য-উপাত্ত চেয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগ (এনআইডি) উইংকে চিঠি দিয়েছে সাব-কমিটি। এই তথ্য পাওয়ার পর সব কিছুর বিচার-বিশ্লেষণ শেষে নতুন সীমানা আইনের খসড়া চূড়ান্তের পর তা আইনে পরিণত করতে সরকারের কাছে পাঠাবে কমিশন। ফলে পুরনো সীমানা আইনের আলোকে আসনবিন্যাস করা হলেও তা হবে সীমিত পরিসরে। খবর ইসির নির্ভরশীল সূত্রের।
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের যুগ্মসচিব (আইন) মো. শাহজাহান বলেন, সীমানা পুনর্বিন্যাস আইনটি যুগোপযোগী করতে হবে, এ নিয়ে কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই। তবে কাজটি করতে গিয়ে পদে পদে জটিলতার উদ্ভব হচ্ছে। কারণ উপজেলার অখন্ডতা, জনসংখ্যা, ভোটার সংখ্যা এবং আয়তন সব কিছু আমলে নেওয়ার পরও ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রাম শহরের আসন অনেক বেড়ে যাচ্ছে। সঙ্গত কারণেই মফস্বলের আসন কমে আসবে। তাই সীমানাবিন্যাস আইনের প্রথম সভাটি করার পর এ ধরনের জটিলতা সামনে চলে আসায় ইউনিয়ন, ওয়ার্ড এবং উপজেলার ভোটার সংখ্যার তথ্য চেয়ে এনআইডিকে চিঠি দিয়েছি। তাদের পাঠানো তথ্য যাচাই-বাছাই করে নতুন আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা হবে। তিনি বলেন, আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে উপলক্ষ করে এটি করা হচ্ছে না, পরবর্তী কমিশনারদের কাজের সুবিধার্থে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাই বলা যায়, জাতীয় নির্বাচনের আগে সীমানা বণ্টন হলেও তা হবে সীমিত আকারে বিদ্যমান আইনের আলোকে।
ইসির কর্মকর্তা বলেন, ১৯৭৬ সালে সামরিক ফরমান জারি করে সীমানাবিন্যাস আইন প্রবর্তন করা হয়। তৎকালীন সরকারের প্রণীত আইনের আলোকে এত দিন ২৯৭ সংসদীয় আসনে পরিবর্তন এনেছে সব কমিশন। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার মার্শাল ল জারি করে প্রণীত সব আইনকে রহিত করে সংসদে আইন পাস করার মাধ্যমে সীমানাবিন্যাস আইনটি নতুন করে প্রবর্তনের বাধ্যবাধকতা চলে আসে। এর আগে ২০১১ সালে সাবেক শামসুল হুদা কমিশন এ-সংক্রান্ত আইনের খসড়া প্রস্তুত করেও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ফলে গত ফেব্রুয়ারিতে মেয়াদপূর্ণ করা কাজী রকিবউদ্দিন কমিশন পুরনো আইনের আলোকে সীমিত কয়েকটি আসনে পরিবর্তন এনে তাদের দায়িত্ব সম্পন্ন করে।
খান মো. নুরুল হুদা কমিশন গত ১৫ ফেব্রুয়ারি দায়িত্বে এনে নির্বাচনী আইনে সংস্কার আনতে সংলাপের পাশাপাশি সংসদীয় আসনের সীমানাবিন্যাস আইনটি নতুন করে সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। এটি প্রথমে কমিশন একটি খসড়া প্রস্তুত করে আইন বিশেষজ্ঞ দিয়ে সব যাচাই-বাছাই করে গত ১৬ অক্টোবর ওই বিশেষজ্ঞ কমিশনকে তার প্রস্তাবনাটি কমিশনে হস্তান্তর করে। এরপর নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানমের নেতৃত্বাধীন আইন সংস্কার কমিটি আরেক দফা পর্যালোচনা করে ইসির যুগ্মসচিব আইনকে আহ্বায়ক করে আরেকটি সাব-কমিটি গঠন করে তাদের অধীনে এটি চূড়ান্ত বিশ্লেষণের জন্য দায়িত্ব অর্পণ করে। গঠিত কমিটি গতকাল বুধবার তাদের প্রথম বৈঠকে নানা অসঙ্গতি খুঁজে পায়। পরে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয় ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা এবং সর্বোপরি একটি আসনের মোট ভোটার সংখ্যা কত, তার সঠিক তথ্য যাচাই করা। এর জন্য এনআইডির কাছে ইউনিটভিত্তিক ভোটার তালিকার তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠায়।
এনআইডির পাঠানো তথ্য নিয়ে আসনওয়ারী মোট ভোটার এবং আদমশুমারি অনুযায়ী জেলাওয়ারী জনসংখ্যা সমন্বয় করে নতুন সীমানাবিন্যাস আইনের খসড়া চূড়ান্ত করবে এই কমিটি। কারণ জনসংখ্যার পাশাপাশি ভোটার সংখ্যা ও আয়তন বিবেচনায় নেওয়ার পরও বিশেষ করে ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের আসন অনেকাংশে বেড়ে যাবে।
এর আগে ২০০৮ সালে ১/১১ শামসুল হুদা কমিশন ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৩৩টিতে ব্যাপক ভাঙচুর করার মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের জেলায় আটটি আসন কমার ফলে ঢাকায় আসন বেড়ে যায়। নতুন প্রণয়ন করতে যাওয়া আইনের ক্ষেত্রেও পুরনো চিত্রই বহাল থাকবে; এ কারণে আইনে কোনো পদ্ধতি সংযোজিত হলে শহর-গ্রামের আসনে অসমতা থাকবে না, এ নিয়েই মূলত গ্যাঁড়াকলে পড়েছে কমিশন। কমিটির লক্ষ্য, যেকোনো মূল্যে সংসদীয় আসনে একটি ভারসাম্য বজায় রাখা।
সীমানাবিন্যাস আইনের সঙ্গে সম্পৃক্ত এক কর্মকর্তা বলেন, এমন বিধান সংযোজন করে সীমানা আইনটি করতে চাই, যাতে পরবর্তী কোনো কমিশনকে সংসদীয় আসনের সীমানাবিন্যাস করতে গিয়ে সংকটে পড়তে না হয়। এর জন্য প্রয়োজনে কিছু জেলায় আসন নির্দিষ্ট করে করে দেওয়া হবে, যা ভোটার ও জনসংখ্যা বাড়ার পরও আসন বাড়ানো-কমানো না লাগে।


