English Version
আপডেট : ১৪ অক্টোবর, ২০১৭ ১৭:২৫

ডিম নিয়ে যা হলো

অনলাইন ডেস্ক
ডিম নিয়ে যা হলো

আণ্ডার বদলে ডাণ্ডা—ঠিক এ ঘটনাই ঘটেছে গতকাল রাজধানীতে। বিশ্ব ডিম দিবসে কম দামে ডিম কেনার প্রতিযোগিতায় নেমেছিল হাজারো মানুষ।

হুলুস্থুল, হট্টগোল, কাড়াকাড়ি সামাল দিতে পুলিশকে একপর্যায়ে লাঠি চালাতে হয়। এতে ডিম কেনা দূরে থাক, পিটুনি থেকে বাঁচতে ক্রেতাদের তীর গতিতে ছুটে পালাতে দেখা যায়। ফলে ভালো একটি উদ্যোগ মাঠে মারা গেল।
বাজারে প্রতি হালি ডিমের দাম ২৪ থেকে ২৮ টাকা। কিন্তু বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষে ১২ টাকা হালিতে ডিম বিক্রির ঘোষণা দিয়েছিল বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি)। এ বিষয়ে বেশ প্রচারণাও চলে। ফলে গতকাল শুক্রবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন ঘিরে জমে হাজার হাজার মানুষের ভিড়। ঠেলাঠেলি, হুলুস্থুলের একপর্যায়ে স্টলে থাকা বেশির ভাগ ডিম ভেঙে ফেলে ক্রেতারা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তখন অ্যাকশনে নামে পুলিশ।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গতকাল ভোর ৫টা থেকেই লোকজন কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনের সামনে আসতে থাকে। অনেকে ফজরের নামাজ পড়ে চলে আসে। অথচ সকাল ১০টা থেকে ডিম বিক্রি শুরুর কথা ছিল। ৮টা বাজতে না বাজতেই লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় পুরো এলাকা। যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় আশপাশের রাস্তায়। এ অবস্থায় ছয়টি কাউন্টারে ডিম বিক্রি শুরু হয়। প্রতি পিস তিন টাকা হিসাবে একজন ক্রেতাকে ৯০টি করে ডিম দেওয়ার ঘোষণা ছিল। সে অনুযায়ী দুই-তিনজনের কাছে ডিম বিক্রির পরই শুরু হয়ে যায় হুড়াহুড়ি। লোকজন কাউন্টারের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এতে সেখানে থাকা বেশির ভাগ ডিমই ভেঙে যায়।

ভোর ৫টায় লাইনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন আগারগাঁও এলাকার বাসিন্দা রাজমিস্ত্রি আবদুল করিম। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একটি লাইনের তিন নম্বরে ছিলাম আমি। কিন্তু দুজন ডিম নেওয়ার পরই হুড়াহুড়ি শুরু হয়। সবাই কাউন্টারে ডিমের ওপর গিয়ে পড়ে। এতে বিক্রিই বন্ধ হয়ে যায়। মনে করেছিলাম ৯০টা ডিম তিন টাকা করে নিতে পারলে অনেক দিন চলে যাবে। তাই কাজ বাদ দিয়ে এসেছিলাম। ’

খামারবাড়ি এলাকায় ডিম কিনতে আসা লোকজন ছিল নানা শ্রেণি-পেশার। শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ছিল অনেক। সবাই ডিম নেওয়ার জন্য ব্যাগ, বালতি, বক্স, খাঁচিসহ নানা জিনিসপত্র নিয়ে এসেছিল। কিন্তু পুলিশের ধাওয়া খেয়ে শূন্য হাতেই ফিরতে হয়েছে তাদের। সকাল ১০টায় বিক্রি শুরু হতে না হতেই তা বন্ধ হয়ে যায়। গেট দিয়ে লোকজনের প্রবেশও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর পরও অনেকে ঢোকার চেষ্টা চালায়। এ সময় পুলিশ লাঠিপেটা শুরু করে। তখন কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনের সামনের রাস্তায় স্লোগান ওঠে—‘ডিম চাই, ডিম চাই’; ‘ডিম চোর, ডিম চোর’; ‘ডিম চোরের বিচার চাই’ ইত্যাদি। অনেকেই আবার স্যান্ডেলসহ নানা জিনিসপত্র ভেতরে ছুড়ে মারে। সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন প্রাঙ্গণে থাকা দুটি ডিমের গাড়ি পুলিশ প্রহরায় বের করে দেওয়া হয়। তখন অনেকেই সেই গাড়ির পেছন পেছন দৌড়ে যায়। কিন্তু সেই গাড়ি আর ধরা দেয়নি। এরপর পুলিশ বাঁশি বাজিয়ে সবাইকে সরিয়ে দিতে শুরু করে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে লোকজনের সংখ্যা কমে আসে।

ডিম কিনতে না পেরে বেশ হতাশ দেখা গেল যাত্রাবাড়ী থেকে আসা তিন বন্ধুকে। তাঁদের একজন শাহজালাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একেকজনের আসতে-যেতে খরচ ৫০ টাকা করে। এ ছাড়া এতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি, পানি কিনতে হয়েছে, খাবারও খেয়েছি। সব মিলিয়ে একেকজনের ১০০ টাকা করে বেরিয়ে গেছে। অথচ ডিম না দিয়ে লাঠিপেটা করা হলো। এভাবে ডেকে এনে লাঠিপেটা করা প্রতারণার শামিল। তাই আমরা আয়োজকদের বিচার চাই। ’

এত হুলুস্থুলের মধ্যেও সকাল ৯টা থেকে সকাল সাড়ে ১১টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন ইন্দিরা রোড থেকে আসা গৃহবধূ নিপা আক্তার। যখন ডিমের গাড়ি পুলিশ প্রহরায় বের হয়ে যায় তখন তিনি লাইন থেকে সরে যান। তিনি বলেন, ‘এই আড়াই ঘণ্টা রোদে দাঁড়িয়ে কষ্ট করলাম। সকালটাই মাটি হয়ে গেল। ’

আয়োজকরা এক লাখ ডিম বিক্রির কথা বললেও বাস্তব অবস্থা ছিল ভিন্ন। কারণ মাত্র দুটি ডিমের গাড়ি দেখা গেছে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন প্রাঙ্গণে। এর বাইরে আরো কিছু ডিম রাখা হয়েছিল স্টলে। সব মিলিয়ে এর সংখ্যা অর্ধ লাখও হবে না বলে জানিয়েছে ক্রেতারা।

কয়েকজন ক্রেতা জানায়, জড়ো হওয়া মানুষের তুলনায় ডিম ছিল কম। এ ছাড়া কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে ছোট স্টলে বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়। অথচ ভেতরে অনেক জায়গা খালি পড়ে ছিল। যদি আরো বড় জায়গায় আয়োজন হতো তাহলে এত বিশৃঙ্খলা হতো না। আর ক্রেতাদের মধ্যে ছিল বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। যারা হল বা বিভিন্ন মেসে থাকে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও ডিম না পাওয়ায় তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ফলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জসীমউদ্দীন হলে থাকা শিক্ষার্থী মোশতাক আহমেদ বলেন, ‘পত্রিকায় লেখালেখি দেখে অনেক বন্ধু মিলে এসেছি। মনে করলাম ৯০টা ডিম পেলে তা রেখে রেখে খাওয়া যাবে। কিন্তু ডিম তো পেলামই না, উল্টো আমাদেরকে লাঠিপেটা করা হলো। ’

তবে নাছোড়বান্দা ছিলেন আলাল হোসেন। তিনি একটি লাল বালতি নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু ডিম না নিয়ে তিনি যাবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন। অবশেষে দুপুর সোয়া ১২টায় একজন পুলিশ সদস্য বিনা মূল্যে তাঁকে একটি ডিম এনে দেন। সেটি হাতে নিয়ে তিনি কালের কণ্ঠ’র এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘সকালে নাশতা না করেই এসেছি। বউকে বলে এসেছি ২৭০ টাকায় ৯০টা ডিম নিয়ে আসছি। ফ্রিজও খালি করা হয়েছে। এখন খালি হাতে গেলে বউ আমাকে বাসায় উঠতে দেবে না। তাই তো অনেক বলে একটি ডিম নিলাম। ’

বিপিআইসিসির সদস্য বিশ্বজিৎ রায় সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভর্তুকি মূল্যে আমরা এক লাখ ডিম বিক্রি করতে চেয়েছিলাম। তবে মানুষের এমন সাড়া পাব ভাবতে পারিনি। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। আমরা ধারণা করেছিলাম এই ডিম নিম্ন আয়ের কিছু মানুষই কিনতে আসবে। যেমন ওএমএসের চাল কিনতে আসে। আমরা ডিম দিতে পারিনি সত্য, এ জন্য আমরা দুঃখিত। তবে ব্যর্থ হয়েছি বলব না, আমাদের ভালো প্রচার হয়েছে। ’

পরে বিপিআইসিসির সভাপতি মসিউর রহমান ফেসবুকে এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ডিম দিবস উপলক্ষে আমরা চেয়েছিলাম নিম্ন আয়ের মানুষ যাতে তাদের এক মাসের ডিম কম দামে কিনতে পারে। এ জন্যই একেকজনকে ৯০টি করে ডিম দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে বিশৃঙ্খলার কারণে সেটি আজ সম্ভব হয়নি। পরে আলোচনা সাপেক্ষে হ্রাসকৃত মূল্যে ডিম বিক্রি করা হবে। ’

বিপিআইসিসি কয়েক বছর ধরে বিশ্ব ডিম দিবসের আয়োজন করলেও তেমন প্রচার পাচ্ছিল না। এমনকি তাদের নিজেদের লোক ছাড়া অন্য কেউ অনুষ্ঠানেই আসত না। তাই এবার তারা ভিন্ন উদ্যোগ নেয়। তিন টাকা পিস হিসেবে ডিম বিক্রির ঘোষণা দেয়। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন, ফেসবুকে প্রচার চলে। ফলে হাজার হাজার মানুষ ডিম কিনতে আসে। এতেই চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।

চট্টগ্রামে ২০ মিনিটেই শেষ  ২৫,০০০ ডিম

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম জানান, বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রামে এক হাজার ডিম বিনা মূল্যে এবং ২৪ হাজার ডিম প্রতিটি চার টাকা দরে বিক্রি করেছে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) এবং জেলা ও বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অফিস।

গতকাল সকাল ১১টায় বিশ্ব ডিম দিবসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। এ সময় মন্ত্রী বলেন, ‘জাপানে বার্ষিক ডিম খাওয়ার পরিমাণ জনপ্রতি ৩৬০টি। সেখানে বাংলাদেশে এই সংখ্যা এখনো মাত্র ৫২টির মতো। এখন পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই ডিম খাওয়ার পরিমাণ বাড়ছে। ’

‘সুস্থ সবল জাতি চাই, সব বয়সে ডিম খাই’ স্লোগান নিয়ে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব, আন্দরকিল্লা শাহি জামে মসজিদ ও জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদের সামনে একযোগে ২৪ হাজার ডিম বিক্রি শুরু হয় গতকাল। এই তিনটি স্পটে সুলভ মূল্যে ডিম কিনতে মানুষের ঢল নামে। মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে শেষ হয়ে যায় সুলভ মূল্যের ডিম।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ২৫ হাজার ডিমের মধ্যে প্রেস ক্লাবের সামনে ছয় হাজার ৫০০টি ডিম বিক্রি করা হয়েছে। এর আগে এক হাজার ডিম বিনা মূল্যে বিতরণ করা হয়। বাকিগুলো আন্দরকিল্লা শাহি জামে মসজিদ ও জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদের সামনে বিক্রি করা হয়েছে।

ডিম দিবসের অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. জিল্লুর রহমান চৌধুরী, বাংলাদেশ পোল্ট্রি ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি রকিবুর রহমান টুটুল ও জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ রেয়াজুল হক।